আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্পছোটগল্পসামাজিক

শিরোনামহীন >> সাফায়েত বিজয় । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

সাফায়েত বিজয় রচিত ‘শিরোনামহীন‘ সামাজিক ছোটগল্পটি আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প প্রতযোগিতা – ০২ এ সপ্তম স্থান অর্জন করে।

খুব তাড়াহুড়ো করে পার্কের ভেতর দিয়ে অফিস যাচ্ছিলাম। আসলে, পার্কের এ মাথায় আমার বাসা আর ও মাথায় অফিস। রিক্সা ভাড়া দশ টাকা হলেও আমি পার্কের ভেতর দিয়ে হেঁটেই যাই। সামান্য শারীরিক পরিশ্রমও হলো টাকাটা বাঁচলো সাথে করে কপোত কপোতীদের হালকা রোমান্সও চোখে পড়ে। নানান বয়সের মানুষের আড্ডাখানা হলো এই পার্ক। আজ যেন অফিস যাবার পথ শেষ হচ্ছেই না। আচমকা বুকে চিনচিন ব্যথা অনুভব করলাম। ঠিক তেরো বছর আগের সেই ব্যথার মতো। আমি বুকে হাত রেখে খালি একটি বেঞ্চে বসে পড়লাম। এই অল্প সময়ে বেশ ঘেমে গেলাম। পকেট থেকে রুমাল নিয়ে চোখ লাগানো চশমাটা মাথার উপরে রাখলাম। ঘাম মুছলাম, যেন শত বছরের ক্লান্তি দূর হলো। না, আজ আর অফিস যাবো না। এই যান্ত্রিক জীবন আর ভালো লাগে না। দিনদিন রোবট হয়ে যাচ্ছি। ঠিক বে-রসিক বুড়ো। আসলে রসিকতা এখন আসেই না। হকার ডেকে পত্রিকা নিলাম, সামনে দিয়ে চা ওয়ালা যেতে ডাক দিয়ে চা নিলাম। পায়ের উপরে পা তুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে পত্রিকা পড়ছি আর চা পান করছি । এই মুহূর্তে আমার চেয়ে সুখী মানুষ বোধহয় আর কেউ নেই। পত্রিকা পড়তেও আজকাল একঘেয়েমি চলে আসে। নিত্যদিন একইরকম খবর বিভিন্ন ভাবে ছাপানো হয়। আমার আবার অক্ষরে অক্ষরে না পড়লে তৃপ্তি লাগে না। তাই মোটামুটি পত্রিকার এসপার-ওসপার করতে করতে ঘণ্টাখানেক লেগেই যায়। পুরো ব্যস্ততম ইট পাথরের শহরের মাঝে এই ক’শতক জায়গা নিরিবিলি। কোনো তাড়া নেই, নেই মানুষ চিৎকার চেঁচামেচি। ঠিক এখানটায় যে মানুষগুলো বসে আছে তারাই রাস্তায় উঠলে কেমন পশু হয়ে যায়! পুরো পার্কে চোখ বুলিয়ে দোকানি আর আমি ছাড়া একজন একা মানুষ পেলাম না। যে যার মতো জোড়া নিয়েই এসেছে। আমি আনমনে দেখছি, দেখছি আর ভাবছি। এই মানুষ গুলোই যখন পরবর্তী জীবনে যাবে তখন কত ক্ষোভ, অভিযোগ এসে হানা দিবে। একসময় সহ্য করে থাকাটাও দায় হয়ে দাঁড়াবে। মানুষ সত্যিই আশ্চর্য এক প্রাণী। গিরগিটি ক্ষণেক্ষণে রঙ বদলায় আর মানুষ সময়ে সময়ে ভেতরের আত্মা বদলায়।
বহুদিন বাদে চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছে করছে, কাগজে মোড়ানো নিকোটিন যেভাবে জ্বলে শেষ হয়ে যায়। একমাত্র নিকোটিনই শুধু কৃতজ্ঞ। মানুষের কষ্টের অবসান ঘটাতে গিয়ে নিজেও জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। ভাবতেই বছর দশেকের একটি মেয়ে সামনে এসে হাজির। হাতে কয়েকটা বেলী ফুলের মালা। মাতাল করানো ঘ্রাণ। আমি মুগ্ধ হয়ে শুঁকছি!
আমি- নাম কিরে তোর?
মেয়েটি- অনুশী, স্যার। একটা মালা নেন স্যার।
– মালা দেয়ার যে কেউ নেই( আক্ষেপের স্বরে)।
– নেন না স্যার। তাইলে কিছু খাইতে পারুম।
কিছুক্ষণ নিরব থেকে,
– তোর মালাগুলো বিক্রি করতে কতক্ষণ লাগতে পারে?
– তার ঠিক নাই স্যার। তিরিশ মিনিট লাগতে পারে আবার তিন ঘণ্টাও।
– মালা কত করে?
– দশ টেকা।
– আয় আমার পাশে বস। আর দেখি মালাগুলো আমার হাতে দে।
– না না, কি কন স্যার? আমার সময় নষ্ট করার মতো সময় নাই। মালা বেচতে না পারলে না খাইয়া থাকতে হইবো।
-আরে সেই জন্য তোকে বসতে বললাম। আমি কিনবো মালা। প্রতি বিশ মিনিট পর একটা।
– আমার কাছে আটটি মালা আছে।
-এই নে তোর টাকা(আশি টাকা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে)।

মেয়েটি হাসিমুখে আমার পাশে বসলো। আমি এবার মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকালাম। কী মিষ্টি চেহারা তার! যত্নের অভাবে একদম আড়াল হয়ে গেছে। চুলগুলো এত রুক্ষ দেখাচ্ছে। চোখ আর জিহ্বা একেবারে সাদা হয়ে গেছে পুষ্টির অভাবে। ভালো খাওয়া মনে হয় বছরে একবারও হয় না। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মায়া জন্মালো। এটা অবশ্য আমার একার না। সবারই এমন মায়া জন্মায়। অন্ধ হয়ে কেউ দু-চার কলম লেখে, কেউ কয় বেলা খাওয়ায়। কারো ভালো লাগলে কয়েকদিন আন্দোলন করে তাদের মৌলিক অধিকার পেতে। এরপর আবার আগের মতো। ক্ষণিকের মায়া। এর চেয়ে বেশি কিছু অবশ্যই আশা করা যায় না। চুপচাপ, কেমন জানি দার্শনিক হয়ে যাচ্ছি! বেলী ফুলের ঘ্রাণ, পাশে বসা অনুশী, আসলে মাঝেমধ্যে জীবনকে অন্যভাবে উপভোগ করতে হয়। একবার অনুশীর দিকে তাকালাম। তাকে পর্যবেক্ষণ করলাম, সাজলে দারুণ দেখাবে মেয়েটাকে। নিজ হাতে সাজিয়ে দিতে মন চাইলো। কিন্তু বেহায়া মন অনেক কিছুই চায়, প্রশ্রয় দেয়া ঠিক না। আবার দিতেও হয়, নইলে ঐ বললাম না, বে রসিক বুড়ো! হঠাৎ প্রাণ খুলে হাসতে লাগলাম। ভালো লাগে আমার। এর মাঝে কখন যে মেয়েটি পালিয়েছে টেরই পেলাম না। যাক চলে, টাকা তো দিয়ে দিয়েছি। বসে থেকে সময় নষ্ট করে কী লাভ? পত্রিকা আর মালাগুলো হাতে নিয়ে উঠতে যাবো, থমকে যায় সময়, নিরবতা বিরাজ করছে পরিবেশে, বুকটা দুমড়ে-মুছড়ে গেলো মুহূর্তে! ধপাস করে বসে পড়লাম। হাতে থাকা পত্রিকা আর মালা মাটিতে পড়ে গেলো। গেইটের পাশে বাদাম গাছটির নিচে বসে আছে বিনু। কোলে ছয় সাত মাসের একটি বাচ্চা। মেয়েই হবে মনে হয়! ও পারলো এমনটা করতে? কত ভালো ভেসেছিলাম! এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ আছে হয়তো। কিন্তু আশেপাশে তো আর কাউকে দেখছি না। ও’কেও খুব মনমরা দেখাচ্ছে। কোলে থাকা মেয়েটিও খানিক বাদে বাদে কেঁদে উঠছে। কিছু বুঝতে পারছি না। তবে কি সংসারে বনিবনা ঠিক মতো হচ্ছে না? পুরোনো স্মৃতি নাড়া দিচ্ছে ভেতরে। বেরিয়ে আসতে চাইছে। ক্রমশ চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল আমার। ঠিক শ্রাবণের মেঘের মতো এখুনি বৃষ্টি ঝরাবে অনায়াসে। হকার ডেকে এক বোতল পানি নিলাম। দুই তিন ঢোক গিলে রুমাল বের করে মুখ মুছে নিলাম আরো একবার। একবার মনে হলো পালিয়ে যেতে, কিন্তু আর কত সময় নিজেকে আসামী বানিয়ে রাখবো বিনুর কাছে? সত্য তো প্রকাশ করতেই হবে। মনে পড়ে গেল তার বিদায়ের দিনের কথা। পাগলটি আমার পায়ে পড়ে গড়াগড়ি দিয়েছিল অনেকক্ষণ। আর এই অপরাধী আমার নামের আগে তখন কুখ্যাত বেকার শব্দটি জড়ানো ছিল। তার জন্যই তো বিনুকে আপন করে নিতে পারলাম না পরিবারের অমতে। দুটো পেট যে পালবার তখন সক্ষমতা ছিল না আমার! বাবা বলেছিল বিনুদের নাকি ভালোবাসা যায়, জীবনসঙ্গী করে একসাথে থাকা যায় না। কি অদ্ভুত নিয়ম আমাদের সমাজব্যবস্থায়! ধিক ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার যোগ্যতা নেই। হু হু করে কেঁদে উঠলো মন। বিনু দুধ আর মাছভাজা খুব পছন্দ করতো। তাই আমি নিজেই গাভী কিনেছিলাম, পুকুর থেকে ছিপ ফেলে মাছ ধরতাম। পাগলীটা আমার হাতের মাছভাজা তৃপ্তি ভরে খেত আর দেখে আমার মন ভরতো। বৃষ্টিতে যখন ও ভিজতো অনেক সুন্দর দেখাতো তাকে। চোখের তুলনা করার মতো শব্দ এখনো অভিধানে আসেনি। অপূর্ব মায়া কাড়া চোখের অধিকারিণী সে। সেদিন খালি হাতে ফিরিয়ে দেবার পর আর আমার চোখের সামনে পড়েনি। আজকে এখনো অবশ্য আমাকে দেখেনি। তাই তার অজান্তেই আমার চোখের সামনে। নিশ্চিত যে, যদি জানতো এসময়ে আমি এখানে থাকবো তাহলে আসতো না। মনে মনে শতসহস্রবার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে বিনুর কাছে। কাছে যাবার সাহস যে সঞ্চার করতে পারছি না। ওর সামনে গেলেই আমি কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। আগ থেকে সব গুছিয়ে যাই, কিন্তু প্রকাশ করতে গেলেই গোলমাল হয়ে যায় সব। আগে যখন আমরা গোপনে দেখা করতাম বিনু আমার গা ঘেঁষে থাকতো। ওর কাছে নাকি ভালো লাগতো! অবশ্য আমারও তাতে আপত্তি ছিল না। নিজের কাছেও ভালো লাগতো। লোক মুখে শুনেছি প্রিয়তম’র সবকিছুই নাকি ভালো লাগে। থাক সেসব কথা। পুরোনো মায়া নতুন করে বাড়িয়ে লাভ কি? বিজ্ঞজনেরা বলে, যখন মায়া কাটাতে শেখা ভালো। আমিও সেই চেষ্টায় আছি। তবে আর নয়। আসামী হয়ে বিনুর কাছে আমি আর থাকতে পারবো না। কোনো অপরাধ করিনি। তাহলে পালিয়ে কেন থাকবো আমি? যে করেই হোক আজ ওর ভুল আমাকে ভাঙাতেই হবে। জানতেই হবে তার বিমর্ষ থাকার কারণ। হতে পারে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার সময় দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। আমি পা বাড়াতে লাগলাম গেইটের পাশে বাদাম গাছটির দিকে যেখানে বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে আছে বিনু।

আমাকে দেখেই অপ্রস্তুত বিনু থতমত খেল। এখানে এভাবে আমাকে হয়ত আশা করেনি। মেকি হাসি দিয়ে ভালোর কথা জিজ্ঞাস করলাম। কোনো উত্তর আসলো না। দেখলাম নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ ঝলমল করছে যেকোনো সময় জমে থাকা বুকের চাপা আর্তনাদ চোখেরজল সেজে গড়িয়ে পড়বে। আমার আশঙ্কাই ঠিক হলো। পারিবারিক জীবনে অসুখী বিনু। পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই যেন দায় এখন তার জন্য। স্বামী বেঈমান তাকে রেখে পালিয়ে গেছে। আমার কাছে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তো এমন বিনুকে চাইনি, তা ভেবে আর আসেনি। আজ আর ফাঁকি দিতে পারলো না। গোঁজামিল দিয়ে অন্যসব চালানো যায়, জীবন নয়। ওর স্বামী চলে যাবার কিছু দিন পর বিনু বুঝতে পারলো তার ভেতর আরও একটি দেহ বেড়ে উঠছে। অনাগত সন্তান নিয়ে শঙ্কিত সে।
একটু ভেবে বিনুর সন্তানকে আমি চাইলাম। ও আর না করলো না। যেন আমার কাছেই ভালো থাকবে বাচ্চাটি, হয়ত এটাই চেয়েছিল বিনু। বাচ্চাটি মায়ের মতো দেখতে হয়েছে। আমার আর সহ্য হচ্ছিল না। বিনুকে জড়িয়ে ধরিয়ে অনেক কাঁদলাম। আশেপাশের সবাই হা করে দেখছে শুধু। আমরা মুহূর্তেই নিজেদের সামলে নিলাম। আর বিনুকে বলে দিলাম, সময় পেলেই যাতে আমাকে আর তার বাচ্চাকে এসে দেখে যায়।

ও’কে কোলে নিয়ে আমি বাসার দিকে ফিরছি। সবাই হয়ত বকাবকি করবে আমার কাজ দেখে। করুক তাতে আমার কি? হয়ত পাগল বলবে, বলুক আপত্তি নেই। একবার পেছনে তাকালাম ছলছল করছে বিনুর চোখ। বাচ্চাটিকে নিয়ে আমি আবার সামনে তাকিয়ে পা বাড়াতেই বিনু মিঁও বলে, লেজ নেড়ে, নতজানু হয়ে আমাদের বিদায় দিলো!
(সমাপ্ত)

আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প প্রতি্যোগতা -০২ এ প্রথম স্থান অর্জনকারী গল্প>> আরিফ মিলন রচিত – মাসুদ রানা ও তার দল

শিরোনামহীন । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প । লেখক পরিচিতি

লেখকঃ সাফায়েত বিজয়
ছোটগল্পঃ শিরোনামহীন
গল্পের জনরাঃ সামাজিক ছোটগল্প
দেশের বাড়িঃ কুমিল্লা।

Tags
পুরো আর্টিকেল পড়ুন

আত্মপ্রকাশ সম্পাদক

আত্মপ্রকাশে অপ্রকাশিত গল্প এবং বুক রিভিউ এবং প্রবন্ধ প্রকাশ করতে যোগাযোগ করুন (ইমেইল-attoprokash.blog@gmail.com) অথবা ফেইসবুক পেইজ ইনবক্স। সর্বনিম্ন ১০০০ শব্দ হতে যেকোনো ঊর্ধ্ব সীমার ছোট গল্প গ্রহণযোগ্য। আপনার গল্প আত্মপ্রকাশ বিচারকদের দ্বারা নির্বাচিত হলে আপনাকে জানানো হবে এবং তা সরাসরি প্রকাশ করা হবে আত্মপ্রকাশে। আপডেট জানতে ফেইসবুক গ্রুপে সক্রিয় থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker