বাংলা ব্যকরণ

বাংলা বানান বিভ্রান্তি । সেলিম রেজার ধারাবাহিক বানান শিক্ষা। পর্ব – ০৫

সমৃদ্ধ বাংলা ভাষায় অসংখ্য বানান নিয়েই আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। যা কোনো ক্ষেত্রে আমাদের বানানের ব্যবহার না জানার কারণে হয়ে থাকে। আবার কিছু বানান বিভ্রান্তি ব্যকরণ গঠিত কারণেও হয়ে থাকে। সেলিম রেজার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত, বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তিকর কিছু পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার তথ্যমূলক পোস্টের পঞ্চম পর্ব আত্মপ্রকাশে প্রকাশ করা হচ্ছে। বাকী পর্বগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ করা হবে।

বাংলা বানান বিভ্রান্তি এবং সংশোধন । সেলিম রেজা । পর্ব – ০৪

উল্লেখ্য যে, আমি কোনো ভাষাবিদ বা বানান বিশেষজ্ঞ নই। ভাষা ও বানান নিয়ে লিখিত বিভিন্ন, বইপুস্তক, জার্নাল থেকে সংগ্রহ এবং গুণীজনদের সাথে আলোচনা করে আপনাদের সুবিধার্থে এই পোস্টটি সাজানোর চেষ্টা করেছি। কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট বক্সে করতে পারেন। যথাযথ উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো।

ও কার এর ব্যবহার

ো ও-কার

অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়া পদ এবং বিশেষণ ও অব্যয় পদ বা অন্য শব্দ যার শেষে ও-কার যুক্ত না করলে অর্থ অনুধাবনে ভ্রান্তি বা বিলম্ব সৃষ্টি হতে পারে এমন শব্দে ও-কার ব্যবহার হবে।
যেমন—
মতো, হতো, হলো, কেনো (ক্রয় করো), ভালো, কালো, আলো ইত্যাদি।

বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া ও-কার ব্যবহার করা যাবে না।
যেমন—
ছিল, করল, যেন, কেন (কীজন্য), আছ, হইত, হইল, রইল, গেল, শত, যত, তত, কত, এত ইত্যাদি।

ভূত এবং অদ্ভুত এর ব্যবহার

দুইটি ছাড়া সকল ভূতে ঊ-কার হবে।
যেমন— উদ্ভূত, ভূত, ভস্মীভূত, বহির্ভূত, ভূতপূর্ব ইত্যাদি।
শুধুমাত্র অদ্ভুত, ভুতুড়ে বানানে উ-কার হবে।

কে, এর এবং এ ব্যবহার

‘কে’
‘এর’
‘এ’

সরলভাবে বাক্য গঠনে ‘-কে’, ‘-এর’ এবং ‘-এ’-কে একসাথে লিখতে হবে।
যেমন–
★ হিরো আলমকে ভোট দিন। (হিরো আলম কে নয়)
★ রহিম ভাইয়ের সালাম নিন (রহিম ভাই এর নয়)।

‘কে’ এবং ‘-এর’-কে আলাদা করতে হলে অবশ্যই হাইফেন ( -) ব্যবহার করতে হবে।
অনেকেই ভুলবশত হাইফেন ব্যবহার করে না।

যেমন—
★ হিরো আলম-কে ভোট দিন।
★ রহিম ভাই-এর সালাম নিন।
★ জুয়েল-এর আগমন।

কিছু বাক্যে এভাবে লিখুন-

রং-এ নয় রঙে, ভাই-এর নয় ভাইয়ের, বউ-এর নয় বউয়ের, যাচাই-এ নয় যাচাইয়ে, অফিস-এর নয় অফিসের, শুটিং-এর নয় শুটিংয়ের, বাংলাদেশ-এর নয় বাংলাদেশের, কোম্পানি-এর নয় কোম্পানির, শিক্ষক-এর নয় শিক্ষকের, স্টেডিয়াম-এ নয় স্টেডিয়ামে লিখতে হবে

এবার মজার বিষয় আপনি প্রায় সময়ই ভুল করে থাকেন এমন কিছু বানান দেখুন আর অবাক হয়ে যান!

শুদ্ধ————–অশুদ্ধ

অ্যাডভোকেট>এডভোকেট
অ্যান্ড>এণ্ড
অ্যাম্বুলেন্স>এম্বুলেন্স
অ্যালবাম>এলবাম
অ্যাসিস্ট্যান্ট>এসিসটেন্ট
আকাঙ্ক্ষা>আকাংখা
আগস্ট>আগষ্ট
আলহাজ>আলহাজ্ব
ইতোমধ্যে>ইতিমধ্যে
ইতঃপূর্বে>ইতিপূর্বে
ইনস্টিটিউট>ইনষ্টিটিউট
উল্লিখিত>উল্লেখিত
এতদ্দ্বারা>এতদ্বারা
কাঙ্ক্ষিত>কাংখিত
কোনো>কোন
কোম্পানি>কোম্পানী
কর্নার>কর্ণার
কর্নেল>কর্ণেল
গভর্নর>গভর্ণর
চাকরি-চাকুরী
চাকরিজীবী>চাকুরীজীবি
চিফ>চীফ
চত্বর>চত্ত্বর
জানুয়ারি>জানুয়ারী
জরুরি>জরুরী
যেকোনো>যে কোন/যেকোন
দেওয়া>দেয়া
দুর্ঘটনা>দূর্ঘটনা
দুর্যোগ>দূর্যোগ
দুর্নীতি>দূর্নীতি
নিখুঁত>নিখুত
নিখোঁজ>নিখোজ
নির্ভুল>নির্ভূল
নেওয়া>নেয়া
নোটারি>নোটারী
নমিনি>নমিনী
প্রত্যয়নপত্র>প্রত্যয়ন পত্র (পত্র একসঙ্গে হবে—চিঠিপত্র, সংবাদপত্র)
পাস>পাশ (Pass)
পিস>পিচ/পিছ (Piece)
পচা>পঁচা
পোস্টার>পোষ্টার
পোস্ট>পোষ্ট
পুনর্মিলন>পূর্ণমিলন/পূনর্মিলন
ফ্যাক্টরি>ফ্যাক্টরী
ফার্নিচার>ফার্ণিচার
ফার্মেসি>ফার্মেসী
ফেব্রুয়ারি>ফেব্রুয়ারী
ফটোস্ট্যাট<ফটোষ্ট্যাট
ফাঁক>ফাক
ব্যাটারি>ব্যাটারী
বিপজ্জনক>বিপদজনক
বিরিয়ানি>বিরাণী
ভুল>ভূল
মার্কশিট>মার্কশীট
মাস্টার<মাষ্টার
মেশিনারি>মেশিনারী
মডার্ন>মডার্ণ
মুহূর্ত>মুহুর্ত/মহুর্ত
রঙিন>রঙ্গিন/রঙ্গীন
রিকশা>রিক্সা
রেজিস্ট্রি>রেজিষ্ট্রি
রেনেসাঁ>রেনেসা
রেস্টুরেন্ট>রেষ্টুরেন্ট
রেস্তোরাঁ>রেস্তোরা
লাইব্রেরি>লাইব্রেরী
লটারি>লটারী
শ্রদ্ধাঞ্জলি>শ্রদ্ধাঞ্জলী
শূন্য>শুন্য/শূণ্য
শনাক্ত>সনাক্ত
শর্তাবলি>শর্তাবলী
শহিদ>শহীদ
স্কলারশিপ>স্কলারশীপ
স্ট্যাম্প>ষ্ট্যাম্প
স্টার>ষ্টার
স্টেশনারি>ষ্টেশনারী
স্টোর>ষ্টোর
সাক্ষ্য>স্বাক্ষ্য
সাক্ষী>স্বাক্ষী
সেক্রেটারি>সেক্রেটারী
সুধী>সূধী
সমিল>ছমিল (করাতকল)
সর্বাঙ্গীণ>সর্বাঙ্গীন
সরকারি>সরকারী
সরণি>স্বরণী/স্মরণী
হর্ন>হর্ণ


পাস এবং পাশ এর ব্যবহার

পাশ:
ইংরেজিতে Side বুঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
যেমন: পার্শ্ব, দিক, প্রান্ত, ধার, কিনারা, সামিপ্য, নিকট, পক্ষ, পার্শ্বদেশ, ইত্যাদি।
যেমন- বাম পাশ দিয়ে চলে যান

পাস:
ইংরেজিতে Pass বা promoted বুঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন: সফল, কৃতকার্য, পরীক্ষায় সাফল্য লাভ, উত্তীর্ণ হওয়া, গেটপাস, অনুমতি পত্র, ছাড়পত্র ইত্যাদি।
যেমন- সে পরীক্ষায় পাস করেছে।

ওপর এবং উপর এর ব্যবহার

উপর ও ‘ওপর’ এ দুটো শব্দের অর্থ নিয়ে কোন ঝামেলা না থাকলেও প্রয়োগ নিয়ে ব্যবহারকারীগণ অনেক সময় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
কবি- সাহিত্যিক, পণ্ডিত ও বৈয়াকরণগণের অভিমত সাধু ভাষা কিংবা চিন্তামূলক প্রবন্ধে ‘উপর বা উপরে’ শব্দটি ব্যবহার করাই দীর্ঘ রীতি।

“উপর” শব্দটির উচ্চারণ হল /উপর্/। বিশেষ্য হিসেবে শব্দটির অর্থ ঊর্ধ্বভাগ এবং ঊর্ধ্বদিক। ঘরের ছাদকেও উপরের অর্থ হিসেবে দেখা যায়। বিশেষণ হিসেবে এর অর্থ তিনটি: ঊর্ধ্বে স্থিত, উচ্চ এবং অতিরিক্ত। উপর এর আর একটি ব্যবহার হল এটি অব্যয় রূপে ব্যবহৃত হয় যার অর্থ প্রতি (ওপর এর সাধু রূপ হল উপর)।
এদিকে, বিশেষ্য হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে “ওপর” /ওপর্/ শব্দটি “উপর” এর অর্থে ব্যবহৃত হয় । যেমন- ঊর্ধ্বভাগ এবং ঊর্ধ্বদিক কিংবা ঘরের ছাদ বোঝাতে শব্দদ্বয় উল্টিয়ে পাল্টিয়ে ব্যবহৃত হয়।
আমরা প্রায়শ ইচ্ছেমতো বাক্যে ‘উপরে’ কিংবা ‘ওপরে’ শব্দ দু’টি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু শব্দগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

সহজ টিপস্

★ ওপর= On
যেমন- টেবিলের ওপর গ্লাসটি রাখা আছে।
★ উপর= Up.
যেমন- আমার মাথার উপর ফ্যানটি ঘুরছে।

উপর’ এবং ‘ওপর- যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না।

সত্তা, সত্ত্ব এবং সত্ত্বা এর ব্যবহার

বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান মতে-

★ ‘সত্তা’ শব্দের অর্থ অস্তিত্ব, স্থিতি, বিদ্যমানতা, বর্তমানতা।

★ ‘সত্ত্ব‘ শব্দের অর্থ স্বত্তা
সুতরাং সত্ত্ব = সত্তা =অস্তিত্ব, স্থিতি,বিদ্যমানতা, বর্তমানতা।
‘সত্ত্ব’ শব্দের আর একটি অর্থ আছে। সেটি হচ্ছে- ফলের রস দ্বারা প্রস্তুত কোন খাদ্যবস্তু।
যেমন: আমসত্ত্ব।
অনেকে ‘সত্তা/সত্ত্ব’ শব্দের পরিবর্তে ‘স্বত্ত্বা’ শব্দ লিখে থাকেন।
‘সত্ত্বা’ শব্দের অর্থ কী কিংবা আদৌ এমন শব্দ বাংলা ভাষায় আছে কিনা আমার জানা নেই।

প্রকৃতপক্ষে ‘সত্তা’ ও ‘সত্ত্ব’ ভিন্ন অর্থদ্যোতক শব্দ। নিজের অধিকারে কোন কিছু আছে বুঝাতে স্বত্ব হবে। কেননা, স্ব মানে নিজে এবং ত্ব মানে অধিকারে। আর অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতা বুঝাতে সৎ+ত্ব= সত্ত্ব । এর দ্বিতীয় অর্থ- প্রকৃতির তিনটি গুণের মধ্যে শেষ্ঠ ‍গুণ। আর তৃতীয় অর্থ হলা- ফলের রস। এর বিশেষ্য হবে-সত্তা।

গাথা এবং গাঁথা এর ব্যবহার

গাথা অর্থ বীরত্ব কাহিনী; কবিতা, শ্লোক, গান, পালাগান ইত্যদি।
যেমন- বিজয়গাথা, বীরত্বগাথা

গাঁথা অর্থ একটির সাথে আর একটি জোড়া দেওয়ার বা সন্নিবেশ করার কাজ।
যেমন- মালা গাঁথা,
রচনা, প্রস্তুত, নির্মাণ (ইট গাঁথা) ইত্যাদি।

অর্থ আর বানানে তফাৎ থাকলেও লেখার সময় অনেকে দ্বিধায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।

★★★ মনে রাখুন-
মালা গাঁথার সময় সুই লাগে। সুই হচ্ছে চন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু কবিতা, বীরত্বকাহিনী বা শ্লোক লেখায় সুই লাগে না। তাই ওগুলোতে চন্দ্রবিন্দু নেই।

বাংলা বানান বিভ্রান্তি । সেলিম রেজার ধারাবাহিক বানান শিক্ষা। পর্ব – ০৬

বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তির হার বেশ ভয়াবহ। সেখান থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিবে সেলিম রেজার সহজ বানান শিক্ষা। পরবর্তী পর্বগুলো ক্রমানুসারে প্রকাশ করা হবে।

Tags
পুরো আর্টিকেল পড়ুন

আত্মপ্রকাশ সম্পাদক

আত্মপ্রকাশে অপ্রকাশিত গল্প এবং বুক রিভিউ এবং প্রবন্ধ প্রকাশ করতে যোগাযোগ করুন (ইমেইল-attoprokash.blog@gmail.com) অথবা ফেইসবুক পেইজ ইনবক্স। সর্বনিম্ন ১০০০ শব্দ হতে যেকোনো ঊর্ধ্ব সীমার ছোট গল্প গ্রহণযোগ্য। আপনার গল্প আত্মপ্রকাশ বিচারকদের দ্বারা নির্বাচিত হলে আপনাকে জানানো হবে এবং তা সরাসরি প্রকাশ করা হবে আত্মপ্রকাশে। আপডেট জানতে ফেইসবুক গ্রুপে সক্রিয় থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker