বাংলা বানান বিভ্রান্তি । সেলিম রেজার ধারাবাহিক বানান শিক্ষা। পর্ব – ০৩

 বাংলা বানান বিভ্রান্তি । সেলিম রেজার ধারাবাহিক বানান শিক্ষা। পর্ব – ০৩

বাংলা-বানান-বিভ্রান্তি-সেলিম-রেজা

সমৃদ্ধ বাংলা ভাষায় অসংখ্য বানান নিয়েই আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। যা কোনো ক্ষেত্রে আমাদের বানানের ব্যবহার না জানার কারণে হয়ে থাকে। আবার কিছু বানান বিভ্রান্তি ব্যকরণ গঠিত কারণেও হয়ে থাকে। সেলিম রেজার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত, বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তিকর কিছু পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার তথ্যমূলক পোস্টের তৃতীয় পর্ব আত্মপ্রকাশে প্রকাশ করা হচ্ছে। বাকী পর্বগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ করা হবে।

বাংলা বানান বিভ্রান্তি এবং বানান সংশোধন । সেলিম রেজা । পর্ব – ০৩

উল্লেখ্য যে, আমি কোনো ভাষাবিদ বা বানান বিশেষজ্ঞ নই। ভাষা ও বানান নিয়ে লিখিত বিভিন্ন, বইপুস্তক, জার্নাল থেকে সংগ্রহ এবং গুণীজনদের সাথে আলোচনা করে আপনাদের সুবিধার্থে এই পোস্টটি সাজানোর চেষ্টা করেছি। কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট বক্সে করতে পারেন। যথাযথ উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। এই পোস্টে কি কি জানতে পারবেন তার একটি তালিকা নিচে দেয়া হলো –

  • কি এবং কী এর ব্যবহার
  • উদ্দেশ্য এবং উদ্দেশ এর ব্যবহার
  • স্ট এবং ষ্ট এর ব্যবহার
  • যুক্তবর্ণে স এবং ষ ব্যবহার
  • কোণ, কোন ও কোনো এর ব্যবহার
  • ব্য এবং ব্যা এর ব্যবহার
  • জ এবং য এর ব্যবহার

কি এবং কী এর ব্যবহার

১. আপনি কি খেয়েছেন?
২. আপনি কী খেয়েছেন?
দু’টো প্রশ্নই একই মনে হচ্ছে, তাই না?

আসুন প্রথম প্রশ্নের উত্তর “হ্যাঁ” কিংবা “না” অথবা মাথা, হাত নেড়ে বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে দেয়া যেতে পারে, তাই তো!
এবার দ্বিতীয় প্রশ্নে আসুন-

আপনি কী খেয়েছেন?
অর্থ্যাৎ কোন জিনিষ খেয়েছেন, হতে পারে ভাত- তরকারী, রুটি- মাংস অথবা চিকেন বিরিয়ানী, মাটনভূনা, কাচ্চি, হাজির বিরিয়ানী ইত্যাদি। এই ধরণের প্রশ্নের উত্তর হবে বিশ্লেষণ ধর্মী, তথ্যবহুল এবং ব্যাখ্যা সহ।

★সংশয় এবং বিস্ময় সূচক বাক্যে “কী” ব্যবহার হবে।
যেমন- কী সুন্দর পাখি!
মেয়েটি কী সুন্দর দেখতে!
আশাকরি সবাই বুঝতে পেরেছেন কখন “কি’ আর কখন “কী” ব্যবহার করবেন।

উদ্দেশ্য এবং উদ্দেশ এর ব্যবহার

শব্দ দুটির প্রয়োগে বানান ও অর্থগত ভিন্নতা আছে।
উদ্দেশ = প্রতি, দিকে, হদিস, জন্য, খোঁজ
যেমন-
★ বইটি ইরার উদ্দেশে পাঠানো হলো ( জন্য)
★ অনেকদিন হলো মিজুমা ম্যাডামের কোনো উদ্দেশ পাওয়া যাচ্ছে না (খোঁজ)
★ আহসান রাফি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করলেন।

উদ্দেশ্য = অভিপ্রায়, লক্ষ্য, তাৎপর্য, প্রয়োজন
যেমন-
★ উপন্যাসটি পড়ে দিপার উদ্দেশ্য বুঝতে পারলাম।
★ দোলার জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নাই।
★ রোদসী উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কাজ করে না।
★ জারা, তুমি কী উদ্দেশ্যে এসব কথা বলছো?

স্ট এবং ষ্ট এর ব্যবহার

বিদেশি শব্দে ‘স্ট’ ব্যবহার হবে। বিশেষ করে ইংরেজি st যোগে শব্দগুলোতে ‘স্ট’ ব্যবহার হবে।
যেমন—
পোস্ট, স্টার, স্টাফ, স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, মাস্টার, ডাস্টার, পোস্টার, স্টুডিও, ফাস্ট, লাস্ট, বেস্ট ইত্যাদি।

ষত্ব-বিধান অনুযায়ী বাংলা বানানে ট-বর্গীয় বর্ণে ‘ষ্ট’ ব্যবহার হবে।
যেমন— বৃষ্টি, কৃষ্টি, সৃষ্টি, দৃষ্টি, মিষ্টি, নষ্ট, কষ্ট, তুষ্ট, সন্তুষ্ট ইত্যাদি।
অর্থাৎ ‘স্ট’-এর উচ্চারণ হবে ‘স্‌ট্’-এর মতো এবং ‘ষ্ট’-এর উচ্চারণ হবে ‘শ্‌টো’-এর মতো।
যেমন—
পোস্ট (পোস্‌ট্‌), লাস্ট (লাস্‌ট্‌), কষ্ট (কশ্‌টো), তুষ্ট (তুশ্‌টো) ইত্যাদি।

 

যুক্তবর্ণে স এবং ষ ব্যবহার

অ/আ-কার
অ/আ কারের পর যুক্তবর্ণে ‘স’ হবে।
যেমন—
তিরস্কার, তেজস্ক্রিয়, নমস্কার, পুরস্কার, পুরস্কৃত, বয়স্ক, ভস্ম, ভাস্কর, ভাস্কর্য, মনস্ক, সংস্কার, পরস্পর, বৃহস্পতি ইত্যাদি। এর ব্যতিক্রম বাষ্প দ্বারা গঠিত শব্দসমূহ।
এছাড়া স্পৃশ্য, স্পর্ধা, স্পষ্ট, স্পন্দ, স্পন্দন, স্পর্শ, স্পৃষ্ট, স্পর্শী, স্মর, স্মৃত/স্মৃতি, স্মিত, স্মরণ, বিস্ময় দ্বারা গঠিত শব্দে ‘স’ হবে।
নিষ্ফল বাদে সকল ‘ফ’-এ ‘স’ হবে।

ই/ঈ-কার
উ/ঊ-কার
এ/ঐ-কার
ও/ঔ- কার
এসব আকারের পর যুক্তবর্ণে ‘ষ’ হবে।
যেমন—
আবিষ্কর, আয়ুষ্কাল, আয়ুষ্কর, আয়ুষ্মান, আয়ুষ্মতী, উষ্ম, কুষ্মাণ্ড, গ্রীষ্ম, গীষ্পতি, গোষ্পদ, চতুষ্কোণ, চতুষ্পার্শ্ব, চতুষ্পদ, জ্যোতিষ্ক, দুষ্কর্ম, দুষ্কর, দুষ্প্রাপ্য, নিষ্কাশন, নিষ্কণ্টক, নিষ্পাপ, নিষ্পত্তি, নৈষ্কর্ম্য, পরিষ্কার, পুষ্করিণী, পুষ্প, মস্তিষ্ক, শ্লেষ্মা, শুষ্ক ইত্যাদি।


কোণ, কোন ও কোনো এর ব্যবহার

কোণঃ ইংরেজিতে Angle/Corner (∠) অর্থে।

কোনঃ উচ্চারণ হবে কোন ইংরেজিতে Which অর্থে বিশেষত প্রশ্নবোধক অর্থে ব্যবহার করা হয়। যেমন— তুমি কোন দিকে যাবে?

কোনোঃ ও-কার যোগে উচ্চারণ হবে। ইংরেজিতে Any অর্থে। যেমন— যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও

ব্য এবং ব্যা এর ব্যবহার

ক্ত, গ, জ/ঞ্জ, ত, থ, ব, ভ, ষ্ট, স্ত-এর পূর্বে ব-এ য-ফলা (ব্য) হবে।
যেমন— ব্যক্ত, ব্যক্তি, ব্যঞ্জন, ব্যতিক্রম, ব্যথা, ব্যর্থ, ব্যবস্থা, ব্যভিচার, ব্যষ্টি, ব্যস্ত ইত্যাদি।

ক, খ, ঘ, দ, ধ, প, প্ত, স, হ-এর পূর্বে ব-এ য-ফলা আ-কার (ব্যা) হবে। যেমন—ব্যাকরণ, ব্যাকুল, ব্যাখ্যা, ব্যাঘাত, ব্যাধি, ব্যাপক, ব্যাপার, ব্যাপ্তি, ব্যাস, ব্যাসার্ধ ব্যাহত ইত্যাদি।

কোলন ব্যবহার( : )

★ উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত বোঝাতে কোলন ব্যবহার হয়।
বাংলা সন্ধি দু প্রকার : স্বরসন্ধি ও ব্যঞ্জনসন্ধি।

★ ব্যাখ্যামূলক/বিবরণমূলক শব্দে কোলন ব্যবহার হয়-

নাম: তানিয়া
পিতার নাম: সেলিম আহমেদ
ঠিকানা: গ্রাম– রামপুরা, ডাকঘর– রহমতপুর, উপজেলা– পত্নীতলা, জেলা– নাটোর।

বিষয়: বিনা বেতনে অধ্যয়নের জন্য আবেদন।
মোবাইল: ০১৭১২-০০০০০০

★ গাণিতিক ক্ষেত্রে কোলন ব্যবহার হয়।
৪:৩ (অনুপাত)

★সময় ও তারিখে কোলন ব্যবহার হয়।
৪:৩০ মিনিট
তারিখ: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

★ নাটকের সংলাপের আগে কোলন ব্যবহার হয়।
রূপা: তুমি হলুদ পাঞ্জাবী পড়েছ কেন?”
হিমু: তুমি নীল শাড়ি পড়েছ, তাই!”

জ এবং য এর ব্যবহার

বাংলায় প্রচলিত বিদেশী শব্দ সাধারণভাবে বাংলা ভাষার ধ্বনিপদ্ধতি-অনুযায়ী লিখতে হবে। যেমন : কাগজ, জাহাজ, হুকুম, হাসপাতাল, টেবিল, পুলিশ, ফিরিস্তি, হাজার, বাজার, জুলুম, জেব্রা।

কিন্তু ইসলাম ধর্ম-সংক্রান্ত কয়েকটি বিশেষ শব্দে ‘যে’, ‘যাল’, ‘যোয়াদ’, ‘যোই’ রয়েছে, যার ধ্বনি ইংরেজি z-এর মতো, সেক্ষেত্রে উক্ত আরবি বর্ণ গুলির জন্য য ব্যবহৃত হওয়া সঙ্গত। যেমন : আযান, এযিন, ওযু, কাযা, নামায, মুয়ায্ যিন, যোহর, রমযান।
তবে কেউ ইচ্ছা করলে এই ক্ষেত্রে য-এর পরিবর্তে জ ব্যবহার করতে পারেন। জাদু, জোয়াল, জো, ইত্যাদি শব্দ জ দিয়ে লেখা বাঞ্ছনীয়।

বাংলা বানান বিভ্রান্তি । সেলিম রেজার ধারাবাহিক বানান শিক্ষা। পর্ব – ০৪

বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তির হার বেশ ভয়াবহ। সেখান থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিবে সেলিম রেজার সহজ বানান শিক্ষা। পরবর্তী পর্বগুলো ক্রমানুসারে প্রকাশ করা হবে।

আত্মপ্রকাশ সম্পাদক

http://attoprokash.com

আত্মপ্রকাশে অপ্রকাশিত গল্প এবং বুক রিভিউ এবং প্রবন্ধ প্রকাশ করতে যোগাযোগ করুন (ইমেইল-attoprokash.blog@gmail.com) অথবা ফেইসবুক পেইজ ইনবক্স। সর্বনিম্ন ১০০০ শব্দ হতে যেকোনো ঊর্ধ্ব সীমার ছোট গল্প গ্রহণযোগ্য। আপনার গল্প আত্মপ্রকাশ বিচারকদের দ্বারা নির্বাচিত হলে আপনাকে জানানো হবে এবং তা সরাসরি প্রকাশ করা হবে আত্মপ্রকাশে। আপডেট জানতে ফেইসবুক গ্রুপে সক্রিয় থাকুন।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *