একুশ শতকের সাহিত্যিক, বুক রিভিউ

অমিতাভ অরণ্য রচিত ‘পরাণ ডোমের পোস্টমর্টেম ’ বইটির রিভিউ নিয়ে, রুপন্তি শাহরিন ‘নহলী গ্র্যান্ড রিভিউ প্রতিযোগিতা‘য় অংশ নিয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। অমিতাভ অরণ্য ‘পরাণ ডোমের পোস্টমর্টেম বুক রিভিউ’ টি নিয়েই আত্মপ্রকাশের এই আয়োজন।

বই: পরাণ ডোমের পোস্টমর্টেম
লেখিকা: অমিতাভ অরণ্য
পৃষ্ঠা: ১২৫
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা
বর্তমান বিক্রয় মূল্যঃ ১৫০ টাকা (৪0% ছাড়) (এপ্রিল, ২০১৯)।
অনলাইন প্রাপ্তিস্থান: নহলী বুকস
রিভিউয়ারঃ রুপন্তি শাহরিন

পরাণ ডোমের পোস্টমর্টেম বুক রিভিউ । অমিতাভ অরণ্য । কাহিনী সংক্ষেপ

লাশ কাটা ঘরে টালমাটাল অবস্থায় বুদ্ হয়ে থাকা পরাণ ডোম এখন ওই পাড়ার মালতীকে নিয়ে আর ঘোরের মধ্যে থাকে না। হাসপাতালের নতুন ফরেনসিক মেডিকেলের ডাক্তার স্নেহা কাজীকে এখন তার বেশ মনে ধরেছে। প্রেম প্রেম অনুভূতি কাজ করলেও সমাজ, পেশা আর অবস্থান একে তো বাধা, তার উপরে স্নেহা ম্যাডামও মন দিয়ে বসে আছে আরেকজনকে। এদিকে প্রফেসর খান মৃত্যুবরণ করার পর থেকে পরাণেরও দিনকাল খুব একটা সুবিধার যাচ্ছে না। মনঃপীড়ন নাকি ক্ষোভ, কিসের জ্বালে কব্জা করেছে পরাণকে?

মানুষের শখের শেষ নেই। জীবনের মতো শখের আছে সাতকাহন। বাবার কাছে শখের মাত্রাটা যেন একটু বেশিই। কিন্তু বাবারা সেই আবদার পূরণ করার সাথে সাথে সময়ের অন্তরালে আমাদের নিজেদের অজান্তে লুকিয়ে ফেলেন সবচেয়ে আকাঙ্খিত ও মূল্যবান বস্তু। আমরা কতজন তার কাছ থেকে তা চেয়ে নিতে সুযোগ পেয়েছি?

তরী আর শৌনকের দাম্পত্য জীবনে কোনো কিছুর অভাব নেই। বিত্ত-বৈভব আর নিত্যদিনের আবদারের সাথে এতো বছরের সাংসারিক জীবন অতিবাহিত হয়ে গেলেও তরীর মনে অনেক প্রশ্ন, আর শৌনকের মনে অবধারিত শংকা, ভয় আর দুর্বিসহ স্মৃতি? কোন পর্দা সরালে বেরিয়ে আসবে অজানা সত্যি? সম্পর্কের টানাপোড়নে ভালোবাসা, প্রেম আর মোহ কোন প্রভাবকের কাজ করে?

জীবনটা খুব ছোট বলে মনে হয় যখন আপনাকে বলা হবে, শেষ সিদ্ধান্ত নিতে, আর শেষ স্বপ্ন দেখতে। কেমন বুকের বা পাশে একটা মোচড় দিয়ে উঠে ব্যাপারটা ভেবে দেখলেই। ‘শেষ সিদ্ধান্ত’ ও ‘শেষ স্বপ্ন’ দুটি আলাদা গল্প, আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সম্পূর্ণ আলাদা জীবন থেকে। কিন্তু বার্তা ও মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা খুব কাছাকাছি।
জ্যোতির বাবা মায়ের সম্পর্কে ক্রমশ অবনতি ঘটছে। ছোট্ট জ্যোতি নিজের মতো খেয়ে দেয়ে বিচরণ করে নিজের জগতে। পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষন্নতা কাটাতে বয়ে চলা ছোট নদীর পাশে গিয়ে বসে থাকতো সে। সেখানেই পরিচয় হয় রূপমের সাথে। বেশ অনেকদিন হয়ে গেলেও রূপম জ্যোতির ব্যাপারে সবকিছু জানলেও, জ্যোতি জানে না রূপমের পরিচয়। যখন সব সত্য সামনে ধরা দিলো স্বচ্ছ আয়নার মতো, তখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি অবাস্তবতার প্রচ্ছদে। জ্যোতি কি পারবে সবটা সামলে উঠতে?
১০টি আলাদা গল্পে সাজানো ‘পরাণ ডোমের পোস্টমর্টেম’ একটি একক গল্প সংকলন।

পরাণ-ডোমের-পোষ্ট-মর্টেম-বই-অমিতাভ-অরণ্য-Poran Domer-post-mortem-book-omitav-oronno

পরাণ ডোমের পোষ্ট মর্টেম – অমিতাভ অরণ্য

পরাণ ডোমের পোস্টমর্টেম বুক রিভিউ । পাঠ পর্যালোচনা

প্রথমেই বলে রাখা উচিত যে নহলী প্রকাশনী খুব চমৎকার কাজ করেছেন বইয়ের বাধাই, মুদ্রণ, প্রচ্ছদ এর কাজের ক্ষেত্রে। নহলীকে নিয়ে বরাবর আশা করা যায়, কারণ এর যুগোপযুগী প্রুফ রিডিং। কিন্তু এ প্রসঙ্গে আমার এই বইটির ক্ষেত্রে কিছু বলার আছে। সে কথা বিস্তারিত আলোচনা পরে করবো। আগে লেখকের কাজ নিয়ে কিছু কথা বলি।

গল্পগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও আলোড়ন সৃষ্টি করে এমন সব গল্পকে এক মলাটের মধ্যে আবদ্ধ করতে গিয়ে লেখক বেশ চমৎকার কিছু কাজ আমাদের উপহার দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তিনি লিখেন ভালো। ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি বেশ কয়েক স্থানে আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, তা তিনি নিজের গ্রামকে ভালোবাসার বলে তার ফল হিসেবে ধরে নিচ্ছি। তা বাদ দিলে, আমার মতে, কোনো গল্পই ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যকে পূরণ করতে পারেনি। কারণ, ছোট গল্পের শেষ বাক্য এমন হওয়া উচিত যে শেষ হয়েও যেন কিছু শেষ হলো না। অনেক গল্পেই আর নতুন করে পাঠকের ভেবে নেওয়ার মতো দুটি অপশন ছিল না। গল্পগুলো কিছুটা উপন্যাসের মিনি ভার্সন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কাহিনী পড়লে এইটুকু বোঝা যায় নতুন লেখক হিসেবে তার ভেতরে অনেক কাহিনী জমা আছে। কিন্তু তাকে সেইভাবে গড়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। ব্যক্তিগত মতামত হলেও, এই বই থেকে ১০টি গল্প পড়েছি। আর লেখককে ভালো করে বোঝার জন্য ১০টি গল্প কম কিছু নয়।
অন্যান্য গল্পগুলো কিছুটা সমসাময়িক, ভিন্ন ধারার নয় বলা যায়। অনেকাংশে পূর্বে অনুমেয়। কিন্তু ‘শেষ স্বপ্ন’ একদম বাক্সের বাইরে চিন্তাভাবনার অনন্য সংযোজন। এইভাবে তো ভেবে দেখিনি, এই কথাটা শুধু এই গল্পের বেলাতেই খাটে।

মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দে ভুগতে, সাসপেন্স, থ্রিল, রহস্য, রোমাঞ্চ যাই বলেই উত্তেজনার রাইডের গল্প বলি না কেন, এর আবেশ থাকা চাই অনেক দিন। ব্রেইনস্টর্মিং ব্যাপারটি খুব মিস করেছি। প্রথম গল্পটিই হতে পারতো একটি উপন্যাস। অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে গল্পগুলোকে বড় করা যেতে পারতো। তাতে যে আবেশের সৃষ্টি হতো তা ৫টি গল্প বললেও যথেষ্ট ছিল।

নহলীর কাছ থেকে বানান বিভ্রাট আশা করা যায় না। সেক্ষেত্রে আমার চাহিদা পূরণ করতে তারা পারে নি। প্রথম গল্পেই ‘স্নেহা কাজী’ কে আরেক স্থানে ‘স্নেহা খন্দকার’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। ‘শেষ সিদ্ধান্তে’ নীলয় আর রুপন্তীর নাম যে কত স্থানে বানান ভুল তা সত্যিই ভালো লাগে নি। অন্যান্য গল্পগুলোতেও বানান ভুলের কারণে দৃষ্টিকটু লেগেছে।

গল্পগুলো খুব সহজে ধরে ফেলা যাচ্ছিলো। যারা প্রচুর থ্রিলার পড়েন, তাদের জন্য খুব সাদামাটা গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু আবেগের স্থান থেকে কিছু কথা হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে।

মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন করার জন্য লেখকের ভাষার ব্যবহারে চিকিৎসা বিদ্যার বেশ কয়েকটি বিশেষ তথ্য সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তবে সকল গল্পের মাঝে সেই বিষয়গুলো বারবার চলে আসাতে পুরো সংকলনটি কোথাও যেন মেডিক্যাল মিষ্ট্রি ঘরানার বই বলে প্রতিপন্ন হচ্ছিলো।

ইতিবাচক ফলাফল এই যে, কিছু গল্প শুধু থ্রিলের জন্য নয়, বরং সামাজিক বিপর্যয় থেকে মানুষকে বের করে পারিবারিক ও আত্মসচেতন করে গড়ে তুলতে অনেকাংশে সাহায্য করবে। এতে আমরা একটি সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আরেকটু গোছাতে দ্বিতীয়বার ভেবে দেখার সুযোগ করতে পারব। শুভ কামনা

বইয়ের ধরণঃ পরাবাস্তব গল্পসংকলন
প্রচ্ছদে এমবোস ও কাগজ ৮০ গ্রাম পারটেক্স
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১২৫
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা
৪০% ছাড়ে বর্তমান মূল্যঃ ১৫০ টাকা
প্রাপ্তিস্থানঃ নহলী বুকস 

Facebook