একুশ শতকের সাহিত্যিক, বুক রিভিউ

এ বি এস রুমন রচিত ‘ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর’ বইটির রিভিউ নিয়ে, জান্নাত জুই ‘নহলী গ্র্যান্ড রিভিউ প্রতিযোগিতা‘য় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। জান্নাত জুঁইয়ের ‘ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর বুক রিভিউ’ টি নিয়েই আজকের আয়োজন।

বই: ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর
লেখিকা: এ বি এস রুমন
পৃষ্ঠা: ১২৮
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা
বর্তমান বিক্রয় মূল্যঃ ১৫০/- (৪৩% ছাড়) (এপ্রিল, ২০১৯)
অনলাইন প্রাপ্তিস্থান: নহলী বুকস
রিভিউয়ারঃ জান্নাত জুঁই

ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর বুক রিভিউ । এ বি এস রুমন

কাহিনী সংক্ষেপঃ ‘ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর’ সামাজিক পটভূমিতে রচিত সমকালীন উপন্যাস, জীবনের চলমান ঘটনাপ্রবাহই যার উপজীব্য বিষয়। রাশেদ-বেলার বিবাহিত জীবনে শৃঙ্খলাহীনতার ছোঁয়া না থাকলেও রয়েছে রাশেদের বেকারত্ব আর অল্পবিস্তর অনটন। তবুও এসব ছাপিয়ে বেলা আর রাশেদ চড়ুইজোড়ার মত জুটি বেঁধে সংসার করে যাচ্ছে যেখানে শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মিশেলে তৈরি হয়েছে প্রকট জীবনবোধ। বিত্তশালী বাবার একমাত্র সন্তান বেলা সম্মৃদ্ধ জীবন, বাবার দেখা ভালো পাত্র আর জটিলতামুক্ত জীবনকে ঠাণ্ডা মাথায় ত্যাগ করে ভালোবেসে রাশেদের হাত ধরে উঠে এসেছিল সাদামাটা এই সংসারে। বাবা ইরাজুদ্দিনের সাথে তাই বেলার রয়েছে দীর্ঘ তিন বছরের সম্পর্কশূন্যতা। রাশেদের একমাত্র ভাই রোদকে নিয়ে বেলা ও রাশেদের আশা-নিরাশার আশঙ্কা কারণ ছেলেটা প্রতিভাবান হলেও বড্ড উদাসীন। গড়ে ওঠে মায়া-রোদের প্রেম যা হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে।

উপন্যাসে আরও রয়েছে আবীর নামের এক রহস্যময় চরিত্র। যার ধর্ম, দেশ, পিতা-মাতা, পরিচয় কিছুই কেউ জানে না তবুও সে বছরের পর বছর মায়ার ভাই হয়ে, রাশেদের বন্ধু হয়ে জীবনযাপন করছে। ইতোমধ্যে রাশেদ-বেলার জীবনে আসে ঝড়, আর সেই ঝড়ে উড়ে যেতে চায় একটা সুখী সংসারের সারাজীবনের লালিত স্বপ্ন। কী সেই সংকট? সেখান থেকে বেলাদের পরিত্রাণ হয় কী? রোদ আর মায়ার সম্পর্ক শেষমেশ কোথায় গিয়ে দাড়ায়? আবীরের পরিচয় আসলে কী? শেষপর্যন্ত রহস্যময় আবীরের পরিচয় পাওয়া যায় কী? এসব প্রশ্নের জবাবের সংমিশ্রণই ‘ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর’

ইচ্ছে-হলে-ছুঁয়ে-দিও-বেপরোয়া-রোদ্দুর-বই-এ-বি-এস-রুমন-icche-holey-chuye-dio-beporua-ruddur-a-b-s-rumon-book

ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিও বেপরোয়া রোদ্দুর বই

ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর বুক রিভিউ । পাঠ প্রতিক্রিয়া

বাস্তবতার উপর বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে মানব মনের আবেগ অনুভূতি মিশ্রিত উপন্যাস একজন ঔপন্যাসিকের সাহিত্যে পারদর্শিতার পরিচায়ক। ‘ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর’ বাস্তবতার নিরিখে সমাজের সচেতন জীবনযাত্রার গল্প। লেখক এখানে ভীষণ স্বভাবজাত বাস্তবতাকে ভিন্নতার মোড়কে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করে প্লট পরিবর্ধন করেছেন। প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ, অভিমান, অভিযোগ সবকিছু বাস্তব জীবনের খুবই স্বাভাবিক অংশ আর এটিই বেলাদের মাধ্যমে প্রাণ রসে পরিপূর্ণ হয়েছে।

ঐশ্বর্যবিত্ত ছাড়াও জীবনে সুখে থাকা যায়। ভালোবাসার মানুষটির হাতের মুঠোয় হাতটা রেখে সব ঝড়ঝাপটা সামলে নিয়ে ভালো থাকা যায়। বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত স্বামীর পাশে নিজের সবটুকু কোমলতা ঢেলে দিয়ে অনুপ্রেরণা দানের মাঝেও তৃপ্তি আছে। কথাগুলো শুধু এই উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র বেলাকে নিয়েই বলা যায়। স্বামী, সংসার সামলে যে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর।

কোনো মানুষেরই অন্যজনের অন্তর্জগতের অনুভূতির তথ্য জানার কথা নয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ইলা মিত্র কন্যা মায়াকে নিয়ে ঠিক এরকমই একটা পরিস্থিতিতে পড়েন। তার মেয়ে ভালোবেসে ফেলে মুসলমান ছেলে রোদকে যা প্রতিবেশী দুই পরিবারের দ্বন্দ্বের কারণ হয়। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্বন্ধ আর যোগাযোগে গড়ে ওঠে সামাজিক আত্মীয়তা, বাড়ে এক পরিবারের প্রতি আরেক পরিবারের টান, স্নেহ আর ভালবাসা কিন্তু সেই সুতোয় টান পড়ে যখন সম্পর্কের অবনতি ঘটে তখন শুরু হয় সামাজিক মতবিরোধ, যার দায়ভার সমাজ নেয় না, দায়ভার গিয়ে বর্তায় ধর্মের উপর। অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় বিশ্বাসের উর্ধ্বে সামাজিকতা প্রকট হয়ে উঠলেও সময়ের প্রবাহে গড়ে ওঠা হিন্দু মায়ার সাথে মুসলিম রোদের ভালোবাসার সম্পর্ক এক বিরাট জটিলতার সৃষ্টি করে।



আবীর, যার চরিত্র প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসের প্রাণ। উপন্যাসে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে রহস্যে ঘেরা আবীর সাসপেন্স ও টুইস্টের সমাগম ঘটিয়ে বস্তুতঃ উপন্যাসকে গতিময়তা দান করেছে। শেষ পর্যন্ত তাই আবীরের পরিচয় জানার জন্য পাঠকের ঔৎসুক হৃদয়কে স্থির করে ধরে রাখতে হবে।

‘বেকার একটা ছেলেকে বিয়ে করে জীবনটা নষ্ট করিস না, জীবনে সুখী হতে পারবি না।’ মেয়ের প্রতি ইরাজ্জুদ্দিনের করা এই উক্তি বেকার রাশেদেরই শুধু নয়, ভালোবেসে সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখা সব তরুণের দীনতা প্রকাশ করে। তবুও রাশেদদের মত ছেলেরা বুকে প্রচণ্ড সাহস আর ভালোবাসা নিয়ে নিরবে প্রিয় মানুষটার হাত আঁকড়ে ধরে। স্বপ্ন দেখে সুখী সংসার, সন্তান আর একটা পরিচয়ের যে পরিচয় তাকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে। হাজারো রাশেদের এই একই স্বপ্ন, হাজারো বেলার এই একই চাওয়া। খুব সাধারণ চাওয়া পাওয়া, ছোট ছোট আকাঙ্ক্ষা তবুও কী যে গভীর আবেগ আর তীব্র ব্যাকুলতা তার হদিস পেতে ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুরে ডুবে যেতে হবে।

উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্র সৃষ্টিতে লেখকের দূরদৃষ্টি আর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তির ক্ষমতা লক্ষণীয়। যেকোনো সাহিত্যকর্মে ঘটনা ও চরিত্র স্বতন্ত্র বা শর্তাধীন নয়, বরং ঘটনা ও চরিত্র একটি অন্যটির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ঔপন্যাসিক এই চরিত্র সৃষ্টি করে পাঠকদের জন্য যেন চরিত্রগুলো পাঠকের হৃদয়ে পরিচিত বা কাছের কারো স্বরূপ হয়ে টিকে থাকে চিরদিন। লেখক হিসেবে চরিত্র, প্লট অথবা ব্যক্তিগত জীবনদর্শন সবকিছু মুক্তচিত্তে প্রকাশ করার স্বাধীনতা আর তার বাস্তবিক প্রয়োগ সবসময়ই সমর্থনযোগ্য। এক্ষেত্রে এবিএস রুমন তার পূর্ণ ব্যবহার করেছেন বাস্তবিকই তাই ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুর হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের সকল সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার সংগ্রামী কাহিনী।

উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটা হলো সংলাপ। একটা চরিত্র সম্পর্কে জানার এবং বোঝার জন্য যথার্থ উপায় হলো সেই চরিত্রের মুখের সংলাপ সৃষ্টি আর এটা গঠনে বিবেচনাবোধ ও বৈচিত্র্যময়তার দ্বারা পুরো ঘটনাটির যথাযথ কথোপকথন তুলে ধরেছেন লেখক যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে উপন্যাসের পাগলীর সম্পর্কে আরও কিছু ঘটনা বাড়ালে মন্দ হতো না।

সচেতন পাঠক ইচ্ছে হলে ছুঁয়ে দিয়ো বেপরোয়া রোদ্দুরের পরতে পরতে নিজেকে অথবা আশেপাশেরই কোনো পরিচিত মানব-মানবীর প্রতিবিম্ব দেখতে পাবেন এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সর্বোপরি এবিএস রুমন নতুন লেখক হিসেবে তার উপন্যাসে অভিযোগ করার মত কোনো অবকাশ রাখেননি।

বই সম্পর্কিত তথ্যঃ
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১২৮
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা
বর্তমান মূল্যঃ ১৫০ টাকা (৪০% ছাড়ে)
প্রচ্ছদে এমবোস ও কাগজ ৮০ গ্রাম পারটেক্স
প্রাপ্তিস্থানঃ নহলী বুকস

Facebook