আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প, ছোটগল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প
রক্তাক্ত-কৃষ্ণচূড়া-সানজিদা-প্রীতি-আত্মপ্রকাশ০নির্বাচিত-গল্প-roktatto-krishnochura-sanjida-preeti-attoprokash-selected-story

রক্তাক্ত কৃষ্ণচূড়া >> সানজিদা প্রীতি | আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প । মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছোটগল্প

Sharing is caring!

“কাজলের কৌটো থেকে আঙুলের মাথায় কিছুটা কাজল নিয়ে চোখের নিচে লেপ্টে পরলো সুরাইয়া। গাঢ় করে কাজলটা পরলো। কপালে টিপটা পরে একপাশে চুলে বেনী করে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিচ্ছে । শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিজেকে শেষ বার দেখে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে গেলো সুরাইয়া। পড়ন্ত বিকেলে হলের পিছনের রাস্তাটা ধরে হেঁটে চলছে সে। দশ মিনিট হাঁটার পর সুরাইয়া দেখতে পেল, তার প্রিয় মানুষটা পুকুরের পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটির নিচে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সুরাইয়া কিছুটা সামনে এসে মিষ্টি হেসে বলল, ”রফিক কখন এসেছ?”
রফিক সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে মুখে হাসির রেখা টেনে বলল, ”এই তো কিছুক্ষণ আগে। দাঁড়িয়ে কেন? বসো।”

সুরাইয়া কপালে থাকা চুলগুলো কানের পাশে গুজে রফিকের পাশে বসলো। রফিক মুগ্ধ নয়নে সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। রফিককে এমন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুরাইয়া বলে উঠল, ”যেমন করে দেখছ মনে হচ্ছে যেন শেষ বারের মত দেখে নিচ্ছো আমায় ! মনে হয় যেন আমাদের আর দেখা হবে না হ্যাঁ?”

রফিক সুরাইয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ”হতেও তো পারে এই তোমায় সারাজীবনের জন্য এখনই শেষ বারের মতো দেখে নিচ্ছি। পরে আর দেখার সুযোগ নাও তো পেতে পারি। এখন যতটা পারি মন প্রাণ ভরে দেখে নিই।”

রফিকের কথা শুনে সুরাইয়া চোখ বড় করে রফিকের হাতে চিমটি বসিয়ে বলল, ”বাজে কথা কি না বললে হয় না?সুযোগ না পাওয়ার মতো কি আছে শুনি?”

রফিক বড় করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “দেশের যে অবস্থা কখন যে কি হয়ে যায় তা কি বলা যায় বলো? ইয়াহিয়া খানের পরে ঢাকায় জুলফিকার আলী ভুট্টো আসলো আলোচনায় অংশ নিতে। হলের বড় ভাইয়াদের আলোচনায় যতটুকু বুঝলাম তাদের ঢাকায় আসার পিছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে। এইদিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য আগাম প্রস্তুত হওয়ার সংকেত আমরা সকলেই পেয়েছি। খুব শীঘ্রই মনে হচ্ছে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।”

সুরাইয়া রফিকের ডান হাতটা ধরে বলল, “শুনো যদি দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তবে আমরা দুজনে একসাথেই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবো। তোমার পাশে থাকবো সব সময়। মরতে যখন হবে দুজনে একসাথে যুদ্ধে গিয়ে দেশের জন্য শহীদ হবো। এইসব নিয়ে একদমই চিন্তা করবে না তো। কোথায় এই সময়টায় আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা কিন্তু দেখো পরিস্থিতি আমাদের কি নিয়ে ভাবাচ্ছে!” বলেই মৃদু হাসলো সুরাইয়া।

রফিক সুরাইয়ার দুই হাত তার হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,” মাঝে মাঝে তোমার কিছু কথা শুনলে মনে হয় আমি ভাগ্য করে তোমায় পেয়েছি। যেই মুহূর্তটায় তোমাকে আমার সাহস দেওয়ার কথা দেখ সেই মুহূর্তটায় তুমি আমায় সাহস দিয়ে কথা বল। তোমার মনের এই জোরটা দেখলে নিজের মধ্যে তখন সব সাহসেরা এসে ভর করে। বাকিটা জীবন দুজনে পাশেই থাকবো ইনশাআল্লাহ।”
দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসির রেখা টানলো। এই হাসির রেখায় রয়েছে বিশ্বাস, আস্থা ও ভরসার মতো কিছু অনুভূতি।

কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে কৃষ্ণচূড়া ফুল ঝরে পড়ছে। রফিক যত্ন করে কিছু কৃষ্ণচূড়া ফুল কুঁড়িয়ে নিল। তারপর টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো এক এক করে সুরাইয়ার চুলে পরিয়ে দিলো সে।
পড়ন্ত এই বিকেলে তাদের এই ভালোবাসা দেখে সূর্যও লজ্জায় ডুব দিতে চাচ্ছে তার ঠিকানায়।

দুজনে তাকিয়ে আছে দূরের ওই আকাশের দিকে। একদল বক উড়ে চলে যাচ্ছে তাদের নীড়ে। তাদের এমন নীড়ে ফিরে যাওয়া রাফিক আর সুরাইয়াকে মনে করিয়ে দিচ্ছে সময় শেষ হয়ে গেছে তাদের এইবার ফিরতে হবে। কিন্তু সময় তাদের মনকে মানিয়ে রাখতে পারছে না। দুজনের মনে হচ্ছে সময়টা এই মুহূর্তেই থমকে যাক। তাদের আরও কিছু সময় দিক পাশাপাশি এমন বসে থাকার জন্য। সময় দিক আকাশের রঙ বদলানোর খেলাটা পুরোপুরি দেখার।

রফিক আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছে,” সুরাইয়া আজকে কেন জানি তোমায় অসম্ভব মায়াবতী লাগছে। তোমার চোখের ওই কাজল আমায় এতোটা মায়া নিয়ে টানছে যে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। শুনো বিয়ের পর তুমি সব সময় কিন্তু এমন করেই চোখের নিচে কাজল পরবে। জানি না কেন জানি মনে হচ্ছে আমাদের আর কখনও হয়তো দেখা হবে না। এই হয়তো আমাদের শেষ দেখা। শেষ দেখায় তোমায় যতটা পারি মন প্রাণ উজাড় করে দেখে নিই।” শেষ কথাটা বলেই রফিক সুরাইয়ার চোখের দিকে তাকালো। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করতে লাগলো।

সুরাইয়া হেসে বলল,” আমাদের না এক সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কথা? যুদ্ধ তো এখনও শুরুই হয়নি তাহলে শেষ দেখা হলো কীভাবে? এই তোমার আজ কী হয়েছে হ্যাঁ? চোখের কোণে বাচ্চাদের মতো এমন পানি নিয়ে আসলে কিন্তু আমিও কান্নায় করে দিব বলে দিলাম।”

রফিক শব্দ না করে হেসে বলল,”আচ্ছা চলো সন্ধ্যা হয়ে গেছে হলে ফিরতে হবে। ”

রফিকের সাথে সুরাইয়া ও উঠে দাঁড়ালো। সুরাইয়া রফিকের দিকে তাকিয়ে বলল,”সাবধানে যেও।আমাদের আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। ”

সুরাইয়ার শেষ কথাটা শুনে রফিক তাকে বাহু ডোরে একবারের জন্য আঁকড়ে ধরলো।

রফিকের এমন কাণ্ড দেখে সুরাইয়া বলল,”ছাড় কেউ দেখে ফেললে কী বলবে! ”

রফিক সুরাইয়াকে ছেঁড়ে বলল,”আজ তোমায় হারানোর ভয় কেন জানি আমায় অস্থির করে তুলছে। নিজেকে শান্ত করতে পারছি না। সন্ধ্যা নেমে গেছে, আচ্ছা যাও তুমি হলে ফিরে যাও।”

সুরাইয়া কিছু বলতে পারছে না। কান্না যেন তার গলা টিপে ধরে রেখেছে। কথা বললেই যেন চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়বে। ধরা গলায় সুরাইয়া শুধু বলল,”হুম।আচ্ছা আসি। আল্লাহ হাফেজ।” বলেই হাঁটতে শুরু করলো সুরাইয়া।

সুরাইয়ার হাতে রফিকের পরিয়ে দেওয়া ফুলগুলো। তার চোখ বেয়ে নেমে আসা প্রতিটা পানির ফোঁটা গিয়ে স্পর্শ করছে প্রতিটি ফুলকে।

২৫শে মার্চ মধ্যরাত,
ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে ঢাকা নগরী। ”অপারেশন সার্চলাইট” সম্পূর্ণ করতে ঘুমন্ত নগরীর রাস্তা কাঁপিয়ে এক এক করে পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে বেড়িয়ে যেতে লাগলো প্রতিটি ট্যাংক। তারা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো শহরটায়। ট্যাংক ভর্তি গোলাবারুদ নিয়ে ছুটে চলছে তারা। তাদের এমন রূপ দেখে রাতের এই অন্ধকারও যেন ভয় পাচ্ছে। ডাস্টবিনের পাশে বসে থাকা কুকুরগুলো অন্যদিন কোনো অশুভ ছায়া দেখলে এক এক করে সবাই ডেকে উঠত। কিন্তু আজ তাদের সামনে দিয়ে একের পর এক ট্যাংক চলে যেতে দেখে কান্নার সুর তুলে সকলে এক সাথে ডাকতে শুরু করলো। তাদের এই ডাক শহরকে জানান দিচ্ছে আগাম বিপদের সংকেত ! হয়নার মতো গুটি পায়ে শিকারের কাছে এসেই শান্ত নগরীতে হঠাৎ করে দানবেরা হামলা করে বসলো। ফার্মগেইট এলাকায় তারা পৌঁছে যখন দেখলো একটি মিছিল তাদের দিকে এগিয়ে আসছে তারা অপেক্ষায় থাকলো সুযোগের। স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসা মিছিলরত মুক্তিকামী বাঙালিরা কাছে আসতেই তাদের উপর বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করতে লাগলো পাকিস্তানি সৈন্যরা। প্রাণ বাঁচাতে কয়েকজন মিছিল ছেড়ে ছুটতে লাগলো রাস্তার ডান পাশটায়। কিন্তু শেষ রক্ষাটা তাদের হলো না। মিলিটারীদের বন্দুক থেকে ছোঁড়া গুলি গিয়ে তাদের বুক ঝাঝড়া করে দিলো। মুহূর্তের মধ্যে শুকনো রাস্তাটি রক্তে ভিজে গেলো। সকলের মৃত দেহটি লুটিয়ে পড়লো রাস্তায়। মিছিলে থাকা বাঙালিদের এমন নৃশংস ভাবে হত্যা করে পাক বাহিনীর দলটি উচ্চ স্বরে হেসে ট্যাংকে উঠে পড়লো বীরত্বের সাথে। রাস্তায় পড়ে থাকা লাশগুলোর উপর দিয়ে ট্যাংক চালিয়ে তারা ছুটতে থাকলো তাদের পরবর্তী মিশনের দিকে।

এইদিকে একই সময়ে পিলখানা আর রাজারবাগ পুলিশ লাইনের চারপাশে চোরের মতো মিলিটারী বাহিনী অস্ত্র নিয়ে সজ্জিত হলো। পিলখানায় থাকা বাঙালি সৈন্যরা শত্রুদের আক্রমণটা কিছুটা আঁচ করতে পেরে সর্তক হয়ে গেলো। কিন্তু এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত কোনো অস্ত্রই নেই! কী করে শত্রুর এমন মোকাবেলা করবে তা নিয়ে চিন্তা করছে সবাই। নিজেদের প্রস্তুত করার আগেই পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণ করে বসে বাঙালি সৈন্যদের উপর। প্রস্তুতি না নিয়েই বাঙালি সৈন্যরা পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। চারপাশ থেকে আক্রমণ করাতে বাঙালি সৈন্যরা দিশাহারা হয়ে পড়ছে। প্রায় ফুরিয়ে এসেছে বুলেট আর গোলাবারুদ। অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর এখনও অগাধ অস্ত্র রয়ে গেছে। বাঙালি সৈন্যদের গোলাবারুদ ফুরতেই মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাক সৈন্যরা নির্মমভাবে হত্যা করতে শুরু করেছে বাঙালি সৈন্যদের। এক ঘন্টা আগেও এখানে প্রাণের চিহ্ন ছিলো কিন্তু মুহূর্তেই প্রতিটি প্রাণ নিশ্চিহ্ন করে শ্মশান ঘাট বানিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে মিলিটারীর ট্যাংক গুলো।

রাত আরও গভীর হচ্ছে। থমথমে শহরটার রাস্তা ধরে ট্যাংকগুলো ছুটে চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো দিকে। পাক সৈন্যদের এখন উদ্দেশ্য হলগুলোতে থাকা ছাত্রছাত্রীদের হত্যা করা। এদের নৃশংস ভাবে হত্যা করে মুক্তিকামীদের কোমড় ভেঙে দেওয়ায় হলো তাদের উদ্দেশ্য। মিলিটারীর একটি ট্যাংক ও দুইটি গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে জগন্নাথ হলের সামনে। আক্রমণের উদ্দেশ্যে গাড়ি থেকে নেমে আসছে পাক সৈন্যরা। আরেকটা হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য অস্ত্র হাতে ঢুকে পড়লো হলের মধ্যে!



রাস্তা কাঁপিয়ে সেই মুহূর্তেই দুইটি ট্যাংক আর তিনটি গাড়ি নিয়ে ইকবাল হলের সামনে থামলো মিলিটারীদের আরেকটি গ্যাং। এই মুহূর্তে বাকিদের সাথে নিষ্পাপ অবস্থায় রফিকও গভীর ঘুমে অচেতন। ছাত্রদের কেউ জানে না এই মুহূর্তে তাদের সাথে কী ঘটতে চলেছে বা কিছুক্ষণ পরে কী হবে তাদের সাথে! মিলিটারীর দল রাইফেল হাতে গেটের দিকে এগিয়ে আসছে। গেটে ঝুলতে থাকা তালা ভেঙে হলের রুমগুলোর দিকে ছুটে আসছে তারা। ১০১ নম্বর রুমের দরজার সামনে এসে দরজায় শব্দ করে কড়া নাড়তে লাগলো এক সৈন্য। এতো রাতে দরজায় এমন শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ১০১ এর ছাত্রদের। রুমে থাকা চারজনে ঘুম ভেঙে উঠে বসলো। একজন উঠে এসে দরজা খুলতেই মিলিটারী সৈন্যটি রাইফেলের বেয়নেট ঢুকিয়ে দিলো তার বুকে। চিৎকার করে ফ্লোরে বসে পড়ে ছেলেটি। ছেলেটির চিৎকারে রুমে থাকা বাকি ছেলেগুলো চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। সাথে সাথে চারজন মিলিটারী রুমের মধ্যে চলে এসে বন্দুক তাক করে ধরেছে ছেলেগুলোর দিকে। ছেলেগুলো কিছু বলার আগেই সৈন্যগুলো গুলি করতে লাগলো তাদের দিকে। হঠাৎ এমন গুলির কান ফাঁটা শব্দে বাকিদের সাথে রফিকেরও ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম চোখে লাফ দিয়ে উঠে বসে বিছানায়। গুলির শব্দ যেন ক্রমশ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। কি হচ্ছে তা বুঝে উঠার আগেই তাদের রুমের দরজায় কয়েকজন মিলে লাথি মেরে দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। ভয়ে রুমের সকলেই জড়সড় হয়ে গেলো। একজন আরেকজনকে ধরে ভয়ে কাঁপছে। রফিকের কপাল বেয়ে ঘাম তার গাল ছুঁয়ে নিচে নামতে লাগলো। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পরেই দরজা ভেঙে রাইফেল হাতে ভিতরে ঢুকে গেলো কয়েকজন সৈন্য। সৈন্যদের একসাথে ঢুকতে দেখে তারা দাঁড়িয়ে গেল। কিছু বলার আগে রফিকদের উপর চালানো হলো অবিরাম গুলি। একটা বুলেট এসে রফিকের বুক ছিদ্র করে বেরিয়ে গিয়ে দেওয়ালে বিঁধলো। তারপর এক এক করে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এসে লাগলো আরও পনেরো কি বিশটির মতো বুলেট। ফ্লোরে বাকিদের সাথে তার দেহটাও লুটিয়ে পড়লো। রফিকের প্রাণহীন দেহটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেলো। পাশের রুমে গুলির শব্দ এখন আর তার কানে পৌঁছাছে না। শুধু গুলি কেন পৃথিবীর কোনো শব্দই এখন আর তার শ্রবণশক্তিতে আঘাত করতে পারছে না। তার খোলা চোখ জোড়া থেকে শুধু দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই পানিটুকু হয়তো তার শরীরে বিদ্ধ করা প্রতিটা বুলেটের আঘাতের জন্য বা বিকেলের বলা শেষ কথা গুলো ভেবেই তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো অথবা সুরাইয়ার জন্য ! অজানা থেকে যাবে গড়িয়ে পড়া এই দুই ফোঁটা পানির কারণ।

রোকেয়া হলেও বাদ দেয়নি হায়নারা। আক্রমণ করার জন্য তারা প্রস্তুত হয়ে হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফাঁকা গুলি করে ছাত্রীদের বাইরে বের করে নিয়ে আসার জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা ফাঁকা গুলির শব্দে প্রতিটা ছাত্রীর বুক কেঁপে উঠছে। ভয়ে চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়ছে। নিজেদের বাঁচানোর জন্য আশ্রয় নিয়েছে খাটের নিচে। বাকিদের সাথে চুপ করে জড়সড় হয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে আছে সুরাইয়াও। মনে প্রাণে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগলো সকলে। এই মুহুর্তে সুরাইয়ার বারবার মনে পড়তে লাগলো রফিকের বলা কথাগুলি। সত্যি যদি তার সাথে আর রফিকের দেখা না হয় তখন কী হবে ! নিজেকে শক্ত করতে চেয়েও শক্ত করতে পারছে না সুরাইয়া। মুখে হাত চেপে কাঁদতে লাগলো। এইদিকে হল থেকে ছাত্রীরা বের হচ্ছে না দেখে নরপিশাচের দল হলের চারপাশে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের শিখা সুরাইয়ার পড়ার টেবিলে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলোর মতো টগবগে লাল হয়ে উপরে উঠতে শুরু করেছে। আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মিলিটারীর দল বাইরে থেকে আগুন আগুন করে চিৎকার করে ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে ছাত্রীদের। আগুনের ভয়ে সকলেই হল থেকে বের হয়ে ছুটতে শুরু করেছে প্রাণ বাঁচানোর জন্য। ছাত্রীদের এমন ছুটে পালাতে দেখে পাকিস্তানি জানোয়ারের দল ছুটে ছুটে তাদের গুলি করতে লাগলো। বাকি ছাত্রীদের সাথে সুরাইয়াও ছুটছে কাঁটাতারের বেড়ার দিকে। কিছু দূর যেতে না যেতে শাড়ি পেঁচিয়ে পড়ে গেলো সুরাইয়া। পাকিস্তানি এক হায়না এসে তার চুলের মুঠি ধরে তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেলো হলের দিকে। কি আশ্চর্য ! যে হলটাতেই সুরাইয়া থাকতো সে হলেই জানোয়ারটা এনে ফেললো সুরাইয়াকে। সৈন্যটি হিংস্র প্রাণীর মত ঝাপিয়ে পড়লো সুরাইয়ার উপর। চিৎকার করে কাঁদছে সুরাইয়া। নিজেকে প্রাণপণে রক্ষা করতে চাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই হায়নাটির সাথে পেরে উঠছে না সে। সুরাইয়ার এমন আর্তনাদ দেখে টেবিলের উপরে থাকা রফিকের দেওয়া ফুলগুলো যেন তার সাথে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। পাকিস্তানি সৈন্যটি তার বর্বরতা শেষ করে সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে একটা পৈশাচিক হাসি দিলো। রাইফেলটা হাতে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে সুরাইয়ার শরীরে আঘাত করে চলছে সৈন্যটি। প্রতিটা আঘাতে রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠছে সুরাইয়া। তার চিৎকারে বাইরের ওই আগুনের শিখাও যেন ভয়ে কেঁপে উঠছে। সৈন্যটি বেড়িয়ে যেতে তারপর পালা ক্রমে আরও পাঁচজন সৈন্য এসে তার উপর অমানবিক বর্বরতা চালাতে লাগলো। সর্বশেষ সৈন্যটি তার ধর্ষণযজ্ঞ শেষ করে এক জাঁক গুলি করলো সুরাইয়ার নগ্ন দেহে। মৃত প্রায় সুরাইয়ার রক্ত ছিঁটকে এসে পড়লো কৃষ্ণচূড়া ফুল গুলোর উপর। রক্ত মাখা ফুল গুলো নতুন অগ্নি বর্ণে নিজেদের সাজিয়েছে। ফুলগুলোর সাথে সুরাইয়াও যেন রক্তে রঞ্জিত হয়ে লাল শাড়ি পড়েছে। প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে এই মুহূর্তে লড়াই করছে সে। সুরাইয়ার শেষ কয়টা নিঃশ্বাস তাকে এখনও ধরে রেখেছে পরপারে যাওয়া থেকে। পরপারে যে কেউ কৃষ্ণচূড়া ফুল হাতে নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে চলেছে সুরাইয়ার জন্য। ইহকালে না পারলেও দুজনে পরকালে যে এক সাথে থাকবে। শেষ ওয়াদাটা হয়তো পূরণ করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সুরাইয়ার আর্তনাদ করতে থাকা দেহটি ছেড়ে আত্মাটি পরপারে পা বাড়িয়েছে।”
…………সমাপ্ত……………

সানজিদা প্রীতি রচিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছোটগল্প >> অপেক্ষা

সানজিদা প্রীতি রচিত ভৌতিক গল্প >> সোমা ও মিনি

অপেক্ষা-সানজিদা-প্রীতি-মুক্তিযুদ্ধের-গল্প-opekkha-sanjida-pretti-min

অপেক্ষা-সানজিদা প্রীতি

রক্তাক্ত কৃষ্ণচূড়া । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প । লেখক পরিচিতি

লেখকঃ সানজিদা প্রীতি
ছোটগল্পঃ রক্তাক্ত কৃষ্ণচূড়া
গল্পের জনরাঃ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছোটগল্প
দেশের বাড়িঃ নোয়াখালী
পড়াশোনাঃ বোটানি বিভাগ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ,(স্নাতকে অধ্যয়নরত আছি) ২০১৮।

Sanjida-Preeti-সানজিদা-প্রীতি-attoprokash-writter

লেখিকা – সানজিদা প্রীতি

সাহিত্যের জগতে এখনও নবীন। লিখালিখিটা প্রথমে শখ হলেও এখন তা নেশায় পরিণত  হয়েছে।ইচ্ছে আছে লিখালিখি নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত যাওয়ার।এছাড়া অবসর সময়টা মুভি দেখে কাটাতে বেশি ভালো লাগে।সব জনরার বই পড়তে ভালোবাসি।

Share this Story
Load More Related Articles
Load More By আত্মপ্রকাশ সম্পাদক
Load More In আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

নীরু >> মাহমুদা মিনি । ভৌতিক । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

মাহামুদা মিনি রচিত ‘নীরু’ ভৌতিক ছোটগল্পটি  ‘আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত ...

Facebook

আত্মপ্রকাশে সাম্প্রতিক

আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

 

attoprokash-bannar

আত্মপ্রকাশে নির্বাচিত গল্পে আপনার গল্পটি প্রকাশ করতে ক্লিক করুন  >> গল্প প্রকাশ

অথবা যোগাযোগ করুন – ফেইসবুক ইনবক্স

ইমেইলঃ attoprokash.blog@gmail.com