আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প, ছোটগল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প
অপেক্ষা-সানজিদা-প্রীতি-মুক্তিযুদ্ধের-গল্প-opekkha-sanjida-pretti-min

অপেক্ষা >> সানজিদা প্রীতি। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছোটগল্প

Sharing is caring!

সানজিদা প্রীতির লেখা ‘অপেক্ষা’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্পটি আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প প্রতিযোগিতা – ০২ এ তৃতীয় স্থান অর্জন করে এবং আনোয়ার পাশা রচিত ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত‘ আলোচিত বইটি পুরস্কার হিসেবে জিতে নেয়।
মুশফিক সাহেব হন্যে হয়ে বাজারের দিকে ছুটছেন। রেশনের যাবতীয় চাল,ডাল,আলু হাতের কাছে যা পাবেন অন্তত এক মাসের জন্য সব কিছুই কিনে নিয়ে আসবেন। তিনি সকাল বেলায় রেডিওতে খবরে শুনতে পেয়েছেন দেশে অবস্থা দিনকে  দিন চরম খারাপ হচ্ছে। সারাদেশে নাকি কারফিউ জারি করা হয়েছে। মিলিটারীরা শহর,গ্রাম কিছুই বাদ দিচ্ছে না। যেখানেই মানুষ দেখছে সেখানেই পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারছে তারা। তাদের এই গ্রামেও যে মিলিটারীরা  আসবে না তার তো কোনো নিশ্চয়তা নাই। তাই তিনি ঠিক করেছেন আগামী এক মাস আর বাড়ি থেকে বের হবেন না। এই এক মাসে যা যা লাগবে সব কিছুই তিনি বাজার থেকে নিয়ে আসবেন। এইদিকে তিনি তার বড় ছেলে, রাসেলকে পাঠিয়েছেন তার বড় মেয়ে শানুকে নিয়ে আসার জন্য। শানু পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।  মুশফিক সাহেবদের পাশের গ্রামেই শানুর শ্বশুরবাড়ি। তারপরও তিনি চান তার মেয়ে তার কাছেই থাকুক এই সময়টাতে। তিনি চেষ্টা করছেন তার সম্পূর্ণ পরিবারটিকে আগলে রেখে সুরক্ষা দিতে। যায় হোক চাল,ডালের সাথে ভালো কিছুও নিতে হবে। বাড়িতে জামাই আসছে তাকে তো আর যেমন তেমন করে আপ্যায়ন করা যায় না।
বাজার শেষ করে বাড়ি ফিরে শানুকে দেখতে পেয়ে মুশফিক সাহেব আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললেন, “শানু মা আমার! তুই আসলি কখন?কতদিন পরে আমার মা’টাকে দেখলাম।জামাই আসে নাই?”
শানু বসা থেকে উঠে মুশফিক সাহেবের পা ধরে সালাম করে বলল,”আব্বা কেমন আছেন? ইসরে ঘামে তো একদম সব কিছু ভিজে গেছে আপনার। এই রাবেয়া,কহিনুর আব্বার হাত থেকে বাজারগুলো নিয়ে যা তো। আপনি একা একা বাজারে গেলেন কেন? আমার জন্য না পাঠিয়ে রাসেলকে সাথে নিয়ে গেলেই তো পারতেন।” শানু নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুশফিক সাহেবের মুখের ঘাম মুছে দিতে দিতে আবার বলল, “এই বয়সে এতো কিছু করা ঠিক না আব্বা। আর আপনার নাকি শরীর খারাপ? এই শরীর খারাপ নিয়ে কেন গেলেন বাজারে?”
মুশফিক সাহেব মৃদু হেসে বললেন,” বয়স হইছে না মা। এখন তো শরীর একটু আধটু খারাপ হবেই। তা জামাই আসে নাই?”
শানু মাথার কাপড়টা টেনে নিয়ে বলল,” আসবেন তিনি। বলল কী কাজ আছে ওখানে যাবেন। দুপুরের দিকে এখানে আসবেন। আব্বা আপনি আগে চলেন তো ঘরে ওইসব কথা পড়েও বলা যাবে।আপনাকে একটু পাখা দিয়ে বাতাস করি।”
মুশফিক সাহেব তার চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে শানুকে সব থেকে বেশি ভালোবাসেন। মেয়ের যেন যত্নের কোনো কমতি না থাকে  তাই তিনি তার স্ত্রী লায়লা বানুকে ডেকে আলাদা করে বলে দিয়েছেন।
এতোদিন পরে বড় বোনকে পেয়ে ছোট ভাই-বোনগুলোর যেমন আনন্দের সীমা নেই তেমনই যেন তাদের কথার ও শেষ নেই। তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন এতোদিন সব কথা তারা জমিয়ে রেখেছে শানু আসলে সব কিছুই বলে শেষ করবে বলে।
সন্ধ্যা বেলায় চার ভাই-বোন মিলে গল্পের আসরে বসলো। গ্রামে কার কী হয়েছে,স্কুলে কী হয়েছে সব কিছুই বলে যাচ্ছে আর খিলখিল করে হাসছে তারা। কথা বলার এক পর্যায়ে রাবেয়া বলল,”জানিস আপা দেশে নাকি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।মিলিটারীরা নাকি মানুষ খুন করছে।”
শানু রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,”তোকে কে বলেছে?কার কাছ থেকে শুনলি এইসব আজগুবি কথা?”
রাসেল তখন বলল,”আপা আজগুবি না এইটা সত্যি কথা।আব্বা প্রতিদিন রেডিও শুনে আমরাও সে রেডিওতেই শুনতে পেয়েছি।এইজন্যই তো আব্বা তোকে এখানে নিয়ে এসেছে।”
শানু কিছু বলতে যাবে তার আগে কহিনুর বলে উঠল, “আপা আজকেও সাতটার সময় রেডিও তে খবর দিবে তখন তুই শুনিস। জানিস আপা রেডিও তে মাঝে মাঝে একটা লোক কেমন করে যেন কথা বলে। শুনলে মনে হয় যেন তার খুব  সর্দি হয়েছে। কথা বললেই সর্দি পড়ে যাবে।” এই কথা বলেই কহিনুর হিহি করে হাসতে শুরু করল।
কহিনুরের এমন উচ্চ হাসির শব্দ শুনে লায়লা বানু রেগে গিয়ে পাশের ঘর থেকে বললেন,”এতো হাসি আসে তোদের কোথেকে?এই ভর সন্ধ্যায় এমন হাসি ভালো না। আল্লাহরে ডাক তাও কাজে দিবে। হাসি বন্ধ করবি তোরা?এমন যে হাসতেছিস তোরা, বিপদ একটা তো ঘরে টেনে নিয়ে আসতেছিস। যত হাসি তত কান্না ভুলে যাবি না। এই আমি বলে রাখলাম তোদের এই হাসি একটা বিপদকে ঘরে ডেকে নিয়ে আসতেছে।”
মায়ের এমন কথা যেন তাদের হাসির জোয়ারকে আরও উসকে দিয়েছে। একজন হেসে আরেক জনের গায়ে পড়ছে তারা।শানু হাসতে হাসতে বলল,”কহিনুর তুই আগের মত খেচরই রয়ে গেলি।আর কিছু বলিস না মা না হয় এইবার ঘরে এসে দুই চারটা পিঠের উপর লাগিয়ে দিবে।”
লায়লা বানু আবার চেঁচিয়ে বললেন,”রাবেয়া,কহিনুর রান্না ঘরের আয়।হাতে হাতে কাজ করলেও তো কাজ গুলো শেষ হয়ে যায়।”
লায়লা বানুর কথা শুনে কহিনুর আর রাবেয়া দুজনে আড্ডা ছেড়ে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও চলে গেলো।
মুশফিক সাহেব এবং শানুর বর মোরশেদ বারান্দায় বসে কথা বলছেন। রাবেয়া দুজনের জন্য সন্ধ্যার চা-নাস্তা নিয়ে এলো।
কথা বলার এক পর্যায়ে মোরশেদ বলল,”আব্বা শুনলাম আপনাদের গ্রামে রাজাকারদের একটা বাহিনী গঠন করা হইছে। এই সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন নাকি?”
মুশফিক সাহেব চশমার ফ্রেম মুছতে মুছতে বলল,”ওইভাবে তেমন কিছুই জানি না। তবে বাজারে টুকটাক কিছু শুনছি। গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলে আর তার বন্ধু-বান্ধবরা মিলে একটা বাহিনী গঠন করছে শুনলাম। গ্রামের চৌকিদারটাও ওই দলে আছে। দলের প্রধান নাকি চেয়ারম্যান নিজেই। মানুষজন ধরে ধরে দাওয়াত দিচ্ছে তাদের দলে যোগ দেওয়ার জন্য।”
এতক্ষণ রাবেয়া দুজনের কথা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল।এইবার সে সাহস করে মোরশেদের দিকে জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,”দুলাভাই এই রাজাকারটা কী?”
মোরশেদ হেসে উত্তর দিলো,”শালিকা তা তুমি বুঝবা না। তবে এইটুকু জেনে রাখ যে যারা এই দেশের মাটির সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে পাকিস্তানী মিলিটারীদের সাহায্য করছে।”
রাবেয়া কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবে তার আগে মুশফিক সাহেব বললেন,”থাক ওইসব নিয়ে আর কোনো কথা বলার দরকার নাই। কে কোথায় লুকিয়ে আবার এইসব শুনে কী প্যাঁচ লাগাবে তার ঠিক নাই। রাবেয়া যা তো রেডিওটা নিয়ে আয় ঘর থেকে।”
রাবেয়া দৌড় দিয়ে গিয়ে রেডিওটা নিয়ে আসলো। সকলে বসে রেডিও’র খবর শুনছে।খবরের শেষে দেশাত্মবোধক গান চলতে শুরু করলো।
রাতে ঘুমানোর জন্য শানুদের দেওয়া হয়েছে আলাদা রুম। শানু আর মোরশেদ পাশাপাশি শুয়ে আছে। শানু একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,”আপনাকে একটা প্রশ্ন করব?”
মোরশেদ উত্তরে বলল,”হুম কর।”
শানু বলতে শুরু করল, “দেশে নাকি যুদ্ধ শুরু হইছে?কিসের যুদ্ধ? আপনিও তো আমারে কিছুই বললেন না এই নিয়ে।আজকে রাবেয়ারা না বললে তো আমি শুনতামই না।”
মোরশেদ বলল,”হুম যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধ। শত্রুদের হাত থেকে প্রতিটি বাঙালিকে রক্ষা করার যুদ্ধ। দেশের মাটিকে রক্ষা করার যুদ্ধ।”
শানু আবারও জিজ্ঞাসা করল,”কার সাথে কে যুদ্ধ করছে?আমাদের এখানে তো সব কিছুই ঠিক আছে তাহলে কেন যুদ্ধ হচ্ছে?”
মোরশেদ শানুর হাতটা নিজের হাতে টেনে নিয়ে বলল,”পূর্ব পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধ। বাঙালিদের সাথে মিলিটারীদের যুদ্ধ। আমাদের দেশটা অনেক বড় শানু। সেখানে আমরা শুধু একটা গ্রামে থাকি।আমাদের হয়তো কিছু হয়নি কিন্তু অনেক গ্রাম রয়েছে যেখানে মিলিটারীরা আগুন দিয়ে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে।”
দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ নিরবতা চলতে থাকলো। মোরশেদ নিরবতা ভেঙে বলল,”শুনো শানু আমাদের সন্তান হওয়ার সময় যদি আমি না থাকি তবে ভয় পেয়েও না। আমাদের যদি ছেলে সন্তান হয় তবে নাম রাখবে স্বাধীন আর যদি মেয়ে সন্তান হয় তবে নাম রাখবে মুক্তি।”
মোরশেদের কথা শুনে শানু উঠে বসে জিজ্ঞাসা করল,”এইসব কী বাজে কথা বলছেন? আপনি থাকবেন না মানে কী?কোথায় যাবেন আপনি?আপনি কী আরেকটা বিয়ে করবেন?”
মোরশেদ শানুর কথা শুনে হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে বলল,”আরেকটা বিয়ে করতে যাব কোন দুঃখ? দেখ শানু কথাটা তোমাকে কয়দিন ধরে বলব বলব বলে ভাবছি।এতদিন বলা হয়ে উঠেনি। আমার মনে হচ্ছে কথাটা এখন বলে দেওয়ায় ভালো। আমি যুদ্ধে যাব। দেশের জন্য লড়াই করবো। দেশকে স্বাধীন করব। তুমি একা থাকতে পারবে না?”
শানু মোরশেদের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,”আপনার কোথাও যাওয়ার দরকার নাই।আপনি আমার সাথেই থাকবেন।আমি আপনাকে কোথাও যেতে দিব না।”
মোরশেদ বড় করে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,”শানু তা হয় না।আমাদের মুক্তির দল গঠন করা হয়ে গেছে।আমরা কালকেই ট্রেনিং এর জন্য বেড়িয়ে যাব। মনটাকে শক্ত কর। নিজেদের কথা না ভেবে দেশের কথা ভাব। এভাবে ঘরে বসে পঁচে মরার থেকেও যুদ্ধে গিয়ে দশটা মিলিটারীকে মারতে গিয়ে শহীদ হওয়াও অনেক ভালো। দেখ তুমি মনটাকে শক্ত কর। আম্মা-আব্বার কাছে এখানেই থাক। তুমি এখানে অন্তত থাকলে আমি যুদ্ধে গিয়েও তোমায় নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকবো। অনেক রাত হইছে ঘুমিয়ে পড়। সকালে যা কথা হওয়ার হবে।”
মোরশেদ চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো। শানুও শুয়ে আছে কিন্তু তার চোখ থেকে যেন ঘুম উধাও হয়ে গিয়েছে।সারারাত সে না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলো।
পরেরদিন সকাল সকাল মোরশেদ বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় শ্বশুরের হাতটা ধরে মোরশেদ বলল,”আব্বা শানুকে আপনার কাছে আমানত রেখে গেলাম।আমি জানি যদিও আপনারা ও’কে খুব যত্নেই রাখবেন তারপরও আবার বলছি ওরে একটু দেখে রাখবেন।”
শানুর কান্না দেখে মোরশেদ তার কাছে গিয়ে বলল,” এই রুমালটা রাখ।নিজেকে শক্ত কর। এই সময় এমন কান্না কাটি করলে আমাদের সন্তানের জন্যই ক্ষতি  হবে।আমার জন্য অপেক্ষায় থেকো।আমি ফিরে আসবো চিন্তা কর না।”
মোরশেদ সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। শানু বাড়ির দরজা ধরে দাঁড়িয়ে কেঁদেই যাচ্ছে।
মোরশেদ যুদ্ধে যাওয়ার পর একবারের জন্যও বাড়ি আসেনি। সময়টাও বসে নেই। দেখতে দেখতে চার মাস কেটে গেলো। শানুর ও বাচ্চা হওয়ার সময়টা ঘনিয়ে এসেছে।
সব কিছুই ঠিকঠাক ভাবে  চলছিল কিন্তু এর মধ্যেই একদিন গ্রামে মিলিটারীরা এসে হাজির হলো। গ্রামের রাজাকার বাহিনী যোগ দিয়েছে তাদের সাথে। রাজাকারের দল মিলিটারীদের ক্যাম্প করার জন্য গ্রামের স্কুলটাকেই ঠিক করে দিল। মিলিটারীদের খুশি করার জন্য মানুষের বাড়ি থেকে হাঁস,মুরগী,গরু,ছাগল যা পাচ্ছে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা। শুধু এখানেই শেষ না, তারা ঘর থেকে যুবতী মেয়েদের জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে মিলিটারী ক্যাম্পে। যেখানে সেসব যুবতী মেয়েদের শরীর নিয়ে দিন রাত খেলে যাচ্ছে মিলিটারী জানোয়াররা। মিলিটারীদের এতোটাই কাছের মানুষ তারা হয়ে উঠেছে যে, মিলিটারীদের সাথে মিলে গ্রামের বড় বাজারটাই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে রাজাকাররা। চেয়ারম্যান আর তার ছেলে মিলে গ্রাম থেকে যারা যুদ্ধে গিয়েছে তাদের পরিবারের একটা লিস্ট বানিয়ে ফেলেছে।
মিলিটারীদের সাথে নিয়ে প্রতিটা পরিবারকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে তারা।
মুশফিক সাহেব ছেলে-মেয়েদের বাঁচানোর জন্য বাড়ির মধ্যে করা গুপ্ত ঘরের মধ্যে শানু,রাবেয়া,কহিনুর ও রাসেলকে লুকিয়ে রাখলেন।
আজ চেয়ারম্যান ও তার দল সহ মুশফিক সাহেবের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো। মিলিটারী ও রাজাকার বাহিনী সম্পূর্ণ বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও মুশফিক সাহেব আর তার স্ত্রীকে ছাড়া কাউকে পেল না। মিলিটারীর দল মুশফিক সাহেবকে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে তার মেয়ের জামাই এখন কোথায়? বাড়ির বাকি সদস্যরা কোথায়।
জবাবে মুশফিক সাহেব শুধু একটা কথায় বলে যাচ্ছেন,”আমি জানি না।”
এক পর্যায়ে চেয়ারম্যানের কথায় মিলিটারীর এক সৈন্য মুশফিক সাহেবের বুকে গুলি চালিয়ে দেয়।
গুলির শব্দ শুনে ঘর থেকে লায়লা বানু দৌড়ে আসেন। তিনি কাছে আসতেই তাকেও গুলি করে মিলিটারীরা।
পর পর দুইটি গুলির শব্দ শুনে রাসেল আর কহিনুর শানুদের কথা না শুনে বেড়িয়ে আসে।
তারা দৌড়ে উঠনে আসতেই দেখে মুশফিক সাহেব এবং লায়লা বানু দুজনেই মাটিতে শুয়ে আছে।
রাসেল উঠনে পড়ে থাকা একটা লাঠি নিয়ে মিলিটারীদের কাছে তেড়ে আসতেই মিলিটারীরা তাকেও গুলি করে মারল। নিজের চোখের সামনে মা-বাবা,ভাইকে মারতে দেখে কহিনুর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,”আল্লাহ গজব তোদের উপরে পড়বে।তোরা আমার আম্মা-আব্বা,ভাইয়াকে কেন মারলি?আমি তোদের আজকে ছাড়ব না।”
বলেই সে রান্না ঘর থেকে দা নিয়ে ছুটে আসলো।
চেয়ারম্যান কর্ণেলের কানে কানে কী যেন বলল।তার পর কর্ণেল আরেক সৈন্যকে ইশারা করে বলল কহিনুরকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে। এইদিকে মিলিটারীর সৈন্যকে  নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে কহিনুর তার হাতের দা টা তার দিকে ছুড়ে মারলো। সৈন্যটার গায়ে গিয়ে দা টা পড়তেই খুব খারাপ ভাবে তার হাতটা কেটে গেলো। সে চিৎকার দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। তখন বাকিদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে কহিনুরের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে তাকে জিপে নিয়ে তুলল।
মিলিটারীরা চলে যাওয়ার পর শানু আর রাবেয়া বেরিয়ে এসে বাবা,মা,ভাইয়ের লাশ ধরে কাঁধতে শুরু করল। এইদিকে কহিনুরকেও ধরে নিয়ে গেছে।তারা এখন কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না।
দুই বোন মিলে সেদিন রাতে তাদের বাবা-মা,ভাইকে মাটি দিল।বাবা-মা, ভাইকে এভাবে জানাযা ছাড়া কবর দিতে হবে তা কখনও তারা ভাবেনি। তারও বা কী করবে?তাদের পরিবারের মতো আরও অনেক পরিবারকেই মিলিটারীরা হত্যা করেছে। জানাযা পড়ার মতো গ্রামে আর এখন কেউ নেই। তাদের পাশের বাড়ির বুড়ি মা ছাড়া পরিবারের সকলকেই গুলি করে মেরেছে মিলিটারীরা।
বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে কহিনুর আর বাড়ি ফিরে আসেনি। শানু আর রাবেয়া নিজেদের রক্ষা করে গেছে মিলিটারী আর রাজাকারদের হাত থেকে। এর মধ্যে একদিন শানুর প্রসব ব্যথা উঠেছে। রাবেয়া শানুর এই অবস্থা দেখে তাদের পাশের বাড়ির বুড়ি মাকে ডাকতে গিয়েছে। বুড়ি আসার ঘন্টা খানেক পরে শানুর সন্তান ভূমিষ্ট হলো। তার একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান হলো। মোরশেদের ঠিক করা নামটাই মেয়ের নাম রাখলো শানু। “মুক্তি”। মেয়ের নাম রেখেছে সে মুক্তি। ক্যালেন্ডারে তারিখ তারিখটা দেখলো শানু। ষোল ডিসেম্বর। শানু তার ডায়েরিতে মুক্তির জন্ম তারিখ আর সালটা লিখে রাখলো। এই ডায়েরিতে শুধু মুক্তির জন্মের কথায় নয় শানু তার জীবনে ঘটে যাওয়া সমস্ত কিছুই লিখে রেখেছে।
সেদিন বিকেলে গ্রামের মিলিটারীর দল গ্রাম থেকে চলে যাচ্ছে।গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে দেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেকে মিলে আনন্দ মিছিল বেড় করেছে।
শানুর আর রাবেয়ার খুশির অন্ত নেই। মুক্তি পৃথিবীতে আসতে তাদের জন্য স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। এইবার কহিনুর, মোরশেদ বাড়ি ফিরে আসবে সে আশায় দুই বোনের চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু পড়তে লাগল।
দিন,মাস, বছর কেটে যেতে লাগল কিন্তু কহিনুর আর মোরশেদ দুজনের কেউই আর বাড়ি ফিরলো না। শানু চোখের পানি ফেলে মোরশেদের জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। তার বিশ্বাস একদিন ঠিক কহিনুর আর মোরশেদ ঠিকি ফিরে আসবে।
————-সমাপ্ত———————
আরো পড়ে নিতে পারেন, সানজিদা প্রীতি রচিত ছোটগল্প >> সোমা ও মিনি
আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প প্রতিযোগিতা – ০২ এ চতুর্থ স্থান অর্জনকারী গল্প > বেদনা বিধুর – আরাফাত তন্ময়

সোমা ও মিনি । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প । লেখক পরিচিতি

লেখকঃ সানজিদা প্রীতি
ছোটগল্পঃ অপেক্ষা
গল্পের জনরাঃ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছোটগল্প
দেশের বাড়িঃ নোয়াখালী
পড়াশোনাঃ বোটানি বিভাগ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ,(স্নাতকে অধ্যয়নরত আছি) ২০১৮।

Sanjida-Preeti-সানজিদা-প্রীতি-attoprokash-writter

লেখিকা – সানজিদা প্রীতি

সাহিত্যের জগতে এখনও নবীন। লিখালিখিটা প্রথমে শখ হলেও এখন তা নেশায় পরিণত  হয়েছে।ইচ্ছে আছে লিখালিখি নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত যাওয়ার।এছাড়া অবসর সময়টা মুভি দেখে কাটাতে বেশি ভালো লাগে।সব জনরার বই পড়তে ভালোবাসি।

Share this Story
Load More Related Articles
Load More By আত্মপ্রকাশ সম্পাদক
Load More In আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

নীরু >> মাহমুদা মিনি । ভৌতিক । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

মাহামুদা মিনি রচিত ‘নীরু’ ভৌতিক ছোটগল্পটি  ‘আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত ...

Facebook

আত্মপ্রকাশে সাম্প্রতিক

আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

 

attoprokash-bannar

আত্মপ্রকাশে নির্বাচিত গল্পে আপনার গল্পটি প্রকাশ করতে ক্লিক করুন  >> গল্প প্রকাশ

অথবা যোগাযোগ করুন – ফেইসবুক ইনবক্স

ইমেইলঃ attoprokash.blog@gmail.com