আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প, ছোটগল্প, রোমান্টিক
অন্তরালে-ভালোবাসা-জান্নাতুল-ফেরদৌস-আত্মপ্রকাশ-নির্বাচিত-গল্প-jannatul-ferdous-attoprokash-selected-love-story (1)-min

অন্তরালে ভালোবাসা >> জান্নাতুল ফেরদৌস । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

Sharing is caring!

জান্নাতুল ফেরদৌস রচিত ‘অন্তরালে ভালোবাসা‘ রোমান্টিক ছোটগল্পটি ভালোবাসা দিবস-২০১৯ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প প্রতিযোগিতা – ০৩’ এ তৃতীয় স্থান অর্জন করে এবং হরিশংকর জলদাস রচিত ‘জলপুত্র‘ উপন্যাসটি পুরস্কার হিসেবে জিতে নেয়।

“বসন্ত আসি আসি করছে। সকালে জানালা দিয়ে মিষ্টি বাতাস গায়ে লাগতেই ঘুম ভেঙে গেল। গতকাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এতদিন পরীক্ষার যন্ত্রণায় অন্যকিছু তো দূরে থাক, নিজের দিকেই তাকানোর সময় ছিল না। যতটা ভয় পাচ্ছিলাম, তার চেয়ে পরীক্ষা অনেক ভালো হওয়ায় মনটাও ফুরফুরে লাগছে। ফ্রেশ হয়ে চায়ের মগটা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বারান্দার গ্রীলের সাথে ঝুলন্ত ফুল গাছের টবগুলো ভেজা দেখছি। তার মানে কেউ গাছের পরিচর্যা করেছে। এ বাড়িতে আমি ছাড়া আর একজনই গাছের দিকে খেয়াল করার মতো আছে; দাদু। কয়েক মাস থেকে ক্লাস, পরীক্ষা নিয়ে এত ব্যস্ত যে গাছের কথা মনে করার সময়ও ছিল না। নিশ্চয়ই দাদু গাছগুলোর যত্ন আত্তি করেছেন। আমি চায়ের মগটা হাতে নিয়ে দাদুর ঘরে গেলাম। দাদুর সাথে অনেকদিন কথা বলার সময়ও করতে পারিনি। কী এক ডাক্তারী পড়া নিয়ে জীবন জলাঞ্জলি দিচ্ছি! ভাবতেই বিরক্ত লাগে।
দাদুর ঘরটা বেশ বড়। ঘরে আগের আমলের সৌখিন কিছু আসবাবপত্র রাখা আছে। এগুলো দাদীমার শখের জিনিস। বাবা অনেকবার আসবাবপত্রগুলো বদলে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দাদীমা রাজি হননি। তার একটাই কথা, এসব জিনিস তার শ্বশুরের নিজ হাতে গড়া। এর মাঝে ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। আজ ছয় মাস হলো দাদীমা এখানে নেই। ছোট কাকা-কাকী দুজনেই সিলেটে সরকারী চাকুরি করেন। তাদের তিন বছরের মেয়েকে দেখাশোনার জন্য দাদীমাকে সিলেটে নিয়ে গিয়েছেন কাকা। এদিকে আমার ছোট ভাই তাসিনের সামনে এস.এস.সি পরীক্ষা। ইংরেজিতে খুবই দূর্বল তাসিন। দাদু তার আমলের বিএ পাস করা। তিনি ইংরেজিতে খুব ভালো বলে বাবা তাসিনকে ইংরেজি শেখানোর দায়িত্ব দাদুকে দিলেন। তাই দাদুর আর যাওয়া হলো না। দাদীমা সিলেটে চলে যাওয়ার পর দাদু নিজের মধ্যে কেমন যেন গুটিয়ে গেলেন। এটা কারও চোখে ধরা না পড়লেও আমি কিছুটা বুঝতে পারি।
ঘরে দাদু নেই। মনে হয় ছাদে গিয়েছেন। আজকাল বেশিরভাগ সময়ই তিনি ছাদে সময় কাটান। বয়স হয়েছে, হয়তো নিরিবিলি থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। আমি চা খাওয়া শেষ করে দাদুর টেবিল গোছাতে লাগলাম। টেবিলের উপর কিছু বিদেশী লেখকদের বই, ডিকশনারি, আর কিছু ডায়েরি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গোছানোর সময় হঠাৎ একটা ডায়েরির ভেতর থেকে একটা সাদাকালো ছবি বেরিয়ে আসলো। বাহ! সুন্দর তো! একটা কিশোরী মেয়ের ছবি। টানাটানা বড় দুটি চোখ আর চিবুকে কালো তিলটা দেখে বুঝতে আর বাকি রইলো না যে এটা দাদীমার কিশোরী বয়সের ছবি। কৌতুহলের বশে ডায়েরিটা খুললাম। নাহ! কিছু নেই। সাদা পৃষ্ঠাগুলো ব্যঙ্গ করছে। একটু পর আবিষ্কার করলাম, ডায়েরির ভেতরে কলম রাখা আছে। কলমটা ধরে সেই পৃষ্ঠা খুললাম। দাদুর গোটাগোটা চমৎকার হাতের লেখা। যদিও কারো ব্যক্তিগত জিনিস বিনা অনুমতিতে দেখি না আমি, তবুও কেন যেন আজ দাদীমার ছবিটা দেখে কৌতুহল দমিয়ে রাখতে পারছি না। আর দাদু বৃদ্ধ মানুষ, কী-ই বা এমন লিখবেন? আমি পড়া শুরু করলাম।



প্রিয় ফুলবউ,
কতদিন হয়ে গেল তোমাকে দেখি না, দেখি শুধু তোমার কিশোরী বয়সের সেই ছবিখানা। তুমি ভালো আছ? জানি এই প্রশ্ন করা অবান্তর। তুমি যে আমাকে ছাড়া ভালো নেই তা আমি ছাড়া এই পৃথিবীর আর কারও বোঝার সাধ্য নেই। বুকের মাঝে হাহাকার নিয়ে যতবার তোমার সরল মুখটা এই ছবিতে দেখি, ততবার আমি ফিরে যাই সেই পুরানো স্মৃতিতে।
তোমার মনে আছে ফুলবউ, সেইবার গাঁয়ের নদীতে নৌকাডুবিতে অনেক মানুষের সাথে তোমার বাবা মাও মারা গেলেন। বৃদ্ধ দাদু ছাড়া তোমার আর কেউ রইল না। দাদুর বয়স হয়ে গিয়েছিল, আজ আছে তো কাল নেই। তোমাকে নিয়ে কী করবে ভেবে ভেবে যখন কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না, ঠিক তখনই তোমার দাদুর বন্ধু, মানে আমার দাদাজান তোমাকে নাতবউ করে সব সমস্যার সমাধান করে দিলেন। তুমি তখন বাচ্চা একটা মেয়ে। ফ্রক আর হাফ প্যান্ট পরো। জীবন সংসার সম্পর্কে তোমার কোনও ধারনাই ছিল না। যদিও আমি তখন কিশোর ছিলাম, তবু বউ যে কাছের কেউ এটুকু বোঝার ক্ষমতা আমার হয়েছিল। তাই তো তোমার কিছু ছেলেমানুষী সবার কাছ থেকে আঁড়াল করে রাখতাম। যেদিন তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসা হলো, তুমি কিছুতেই আমার পাশে ঘুমাবে না। কেঁদে কেটে অস্থির। আমি তখন তোমার মাথায় বিলি কাটতে কাটতে ভূতের গল্প বলে তোমাকে ঘুম পাড়াই। তারপর থেকে তোমার রোজ বায়না ছিল রাতে ভূতের গল্প বলে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। আচ্ছা বলো তো, এত গল্প আমি কোথায় পাবো? তাই বানিয়ে বানিয়ে যা মনে আসে তাই বলে যেতাম। তুমি একটুও বুঝতে পারতে না। আমি সারাদিন পর বাড়ি আসলে তুমি তোমার কাপড়ের তৈরী পুতুলের বাক্স নিয়ে বসতে আমার সাথে পুতুল বউ খেলার জন্য। না খেলতে চাইলে তোমার সে কী অভিমান! গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে। আমি প্যান্টের পকেটে করে হাট থেকে তোমার জন্য কেনা বাতাসা আর নকুলদানার ঝুলি বের করতেই এক নিমিষে অভিমান দূর হয়ে তোমার মুখে খুশির ঝিলিক ফুটতো। দিনে পড়াশোনার জন্য বাইরে থাকতে হতো আমাকে, এই সুযোগে তুমি গাছে গাছে উঠে পাখি খুঁজতে। তোমাকে কতবার বলেছিলাম, বাড়ির বউ এভাবে গাছে উঠতে নেই। কে শোনে কার কথা? অবশ্য এ কথা বোঝার মতো বয়সও তোমার ছিল না। একবার বাড়ির দক্ষিণ দিকের জামরুল গাছে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে ডান পা মচকে ফেললে। উহ! ব্যাথায় সারাটা দিন আমার কোল থেকে নামছিলেই না। সন্ধ্যায় গাঁয়ের কবিরাজ বাবু এসে হলুদ আর চুনের প্রলেপ দিয়ে তোমার পা বেঁধে দিলেন। রাতটা কাটলো যেমন তেমন, বিপত্তি বাঁধলো পরের দিন। গাঁয়ে মেলা শুরু হলো। তুমি বায়না ধরলে মেলায় নিয়ে যেতেই হবে। কত করে বুঝালাম, পা ঠিক হোক, পরেরবার নিয়ে যাবো। কিন্তু না, তোমার কান্নার কাছে হার মেনে অবশেষে কোলে করে তোমাকে নিয়ে সারা মেলায় ঘুরে বেড়ালাম। বাড়িতে আসার পর বউকে কোলে নিয়ে মেলায় ঘুরেছি বলে মা তো হেসে কুটিকুটি। সেদিকে তোমার কোনও নজর নেই। তুমি আছো মেলা থেকে কেনা আলতা, ফিতা, চুড়ি আর বাঁশি নিয়ে।
এভাবে কেটে গেল কয়েকটা বছর। তুমি একটু একটু বড় হলে, আর একটু একটু বুঝতে শুরু করলে। সেদিনের কথা মনে আছে? যেদিন ফ্রক ছেড়ে তুমি প্রথম শাড়ি পরে আমার সামনে এসেছিলে, সেদিন লজ্জায় আমার দিকে তাকাতে পারছিলে না। সেইবার বেশ দীর্ঘ সময় পর আমি শহর থেকে বাড়ি আসলাম। তোমাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ দেখি লাল টুকটুকে শাড়ি পরে লম্বা ঘোমটা টেনে কে যেন আমার জন্য পানি নিয়ে ঘরে ঢুকলো। হাতে লাল কাঁচের চুড়ির রিনঝিন আওয়াজ হচ্ছিলো। আমি হকচকিয়ে গেলাম। ভাবলাম আমাদের বাড়িতে নতুন কে এলো? পরক্ষণেই তোমার হাতের কালো জটটা দেখে বুঝে গেলাম, এ যে আমার ফুলবউ! আমি গ্লাসটা না ধরে খপ করে তোমার হাত ধরলাম। অমনি আমার হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য তুমি মরিয়া হয়ে উঠলে। আমিও নাছোরবান্দা! গ্লাসটা টেবিলে রেখে এক টানে তোমাকে কাছে নিয়ে আসলাম। ঘোমটা টেনে ফেলে দেখি লজ্জায় তোমার ধবধবে সাদা গাল দুটো হালকা লাল হয়ে গিয়েছে। যখনই আমার ঠোঁট তোমার গাল ছুঁই ছুঁই করছে, তখনই তুমি দরজার দিকে তাকিয়ে “মা এসেছে” বলে উঠলে। আমিও শঙ্কিত হয়ে তোমাকে ছেড়ে দিয়ে ধপ করে উঠে বসি। যখন দরজায় কাউকে না দেখে বুঝতে পারলাম তুমি মিথ্যে বলেছো, ততক্ষণে তুমি আমার হাত থেকে বাঁচতে এক দৌড়ে পালিয়ে গেলে।
ফুলবউ, হাসছো কেন? ভাবছো বুড়ো বয়সে এসব আবার কেন লিখছি? আমি জানিনা কেন লিখছি। হয়তো তোমাকে পাশে না পেয়েই তোমার স্মৃতি ডায়েরিতে বন্দি করে তোমাকে খুঁজে ফিরছি।
সেদিন মিথ্যে বলে আমার হাত থেকে বেঁচে গেলেও, পরে কিন্তু ঠিকই ধরা দিলে। বিয়ের পরে সেদিনই ছিল আমাদের প্রথম বাসর রাত। এক রকম বলা চলে, অন্তরালে প্রথম বাসর। কেউ জানেনি। তোমাকে সেদিন প্রশ্ন করেছিলাম, “বলো তো, আমি তোমার কে হই?” তুমি লাজুক কণ্ঠে বলেছিলে, “মা বলেছেন, আপনার নাম মুখে আনতে নেই।”
তাহলে বলো তুমি আমার কে?”
-ফুলবানু।”
-উহু। তুমি আমার ফুলবউ।”
সেদিন থেকে এক নতুন রূপে তুমি আমার ফুলবউ হয়ে গেলে। কী এক মায়া, কী এক বন্ধনে বেঁধে গেলাম আমি। তোমাকে ছাড়া আর শহরে যেতে মন চাইলো না। বাবা মাও বুঝতে পারলেন আমার মনের কথা। তাই তো তারাও কোনও বাধা দেননি। সেই বাসর থেকে এতগুলো বছর তুমি একটা দিনের জন্যও আমার কাছ থেকে দূরে থাকোনি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার ঐ নিষ্পাপ মুখখানা না দেখে আমার একটা দিনও শুরু হয়নি। কখনও ভাবিনি, মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ কাউকে ছাড়া দূরে থাকবো। অথচ নিয়তি আজ আমাদের দুজনকে দুই প্রান্তে রেখেছে। আমি জানি ফুলবউ, আমার মতো তোমারও প্রতিটা দিন কাটে অসহ্য যন্ত্রণায়; প্রতিটা রাত কাটে শূণ্যতা নিয়ে। তবুও আমাদের সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তুমি আমি নিশ্চুপ। তুমি যেদিন সিলেটে চলে যাচ্ছিলে, মনে হয়েছিল চিৎকার করে বলি, তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না, তুমি যেও না ফুলবউ। কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে ছেলে মেয়েদের সামনে কিছু বলতে পারিনি। ওরা হয়ত ভাববে, বুড়ো বয়সে কিসের এত ভালোবাসা? আচ্ছা ফুলবউ, বয়সের সাথে সাথে কি ভালোবাসাও বৃদ্ধ হয়? আমার চোখের ঝাঁপসা দৃষ্টির মতো কি ভালোবাসাও ঝাঁপসা হয়ে যাওয়ার কথা? যদি তাই হয়, তাহলে কেন রাতে ঘুম ভাঙলে চিরচেনা অভ্যাসের আদলে শূণ্য বিছানায় তোমাকে হাতড়ে বেড়াই? জানি না তোমার সাথে আর আমার দেখা হবে কিনা। নাকি, মৃত্যুই আমাদের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে।
আমি ধাম করে ডায়েরিটা বন্ধ করে ফেললাম। পরের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পড়ার মতো ক্ষমতা আমার নেই। আমার চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা পানি পড়লো ডায়েরির উপর। নিজেকে কেমন স্বার্থপর লাগছে। আমরা শুধু নিজের ভালোবাসা, ভালোথাকা নিয়েই ব্যস্ত। অথচ এতগুলো বছর যারা একই ডোরে বাঁধা ছিল, তাদের ভালো থাকার কথা, ভালোবাসার কথা একবারও ভাবলাম না কেউ। আমি দাদুর ঘর থেকে বেরিয়ে আশিককে ফোন দিলাম।
-কী খবর প্রিয়া ম্যাডাম? আজ সকাল সকাল মনে প্রেম জাগলো নাকি?”
-দুষ্টুমি রাখো তো। দরকারে ফোন দিয়েছি।”
-বাবা! তোমার ওই ডাক্তারী হাবিজাবি বই ছাড়াও দরকারী কিছু আছে বলে জানতাম না তো!
-উহ! ঘ্যানর ঘ্যানর বন্ধ করো তো।”
-জ্বি ম্যাডাম, করলাম। এখন বলেন কী দরকারে এই অভাগা প্রেমিককে সকাল সকাল মনে পড়লো?”
-কাল আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে। পরশু ফিরবো ঢাকায়। রেডি থেকো।”
-পরশু তো ১৪ই ফেব্রুয়ারি!”
-হু। তো? সমস্যা কী?”
-নো সমস্যা জাঁহাপনা। আপনি বললে বনবাসে যেতেও রাজি আছি। কিন্তু হেতু কী জাঁহাপনা? আমাদের তো বিয়ে ঠিক হয়েই আছে। তাহলে আমাকে নিয়ে পালানোর ইচ্ছা জাগলো কেন?”
-তোমার মুণ্ডু খাবো, এজন্য পালাবো। রাখি।”
রাত কত হবে? আনুমানিক নয়টা; বা তার চেয়ে কিছু কম। দাদু লাঠিতে ভর করে ঠুকঠুক শব্দে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে আসলেন। বসার ঘরের দরজার সামনে এসেই তিনি বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ঘরের মাঝ বরাবর বাবা, মা, তাসিন, আশিক আর আমি কেক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দাদুকে দেখেই তাসিন, আশিক আর আমি একসাথে চিৎকার করে বলে উঠলাম, “হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে দাদু।”
দাদু ভেতরে এসে আমাদের তিনজনকে জড়িয়ে ধরলেন।
-দাদু কেক কাটো।”
-কী যে বলিস দিদিভাই, বুড়ো মানুষের এসবে মানায় না। তোরাই আনন্দ কর। আমি বরং আমার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেই।”
আমি ঠোঁট উল্টিয়ে বললাম, “হুম, বুঝেছি। আমাদের সাথে তো আর কেক কাটতে তোমার ভালো লাগবে না।”
-এই দেখো, কখন বললাম তোদের সাথে ভালো লাগবে না? আমি বুড়ো মানুষ, এসব কি আর আমার ভালো লাগে বল?”
-ঠিক আছে, কেক না হয় না কাটো, তোমার জন্য একটা উপহার আছে, ওটা নিয়ে তারপর ঘরে যাও।”
-আবার উপহার কেন দিদিভাই?”
-যেন তেন উপহার না। অনেক দূর থেকে তোমার জন্য নিয়ে এসেছি। তার আগে চোখ বন্ধ করো।”
-পাগলীর কাণ্ড দেখো। আবার চোখ বন্ধ করতে হবে। আচ্ছা করলাম।”
কয়েক সেকেন্ড পর দাদুর সামনে এসে বললাম, “এবার চোখ খোলো।”
দাদু চোখ খুলেই হকচকিয়ে গেলেন। অস্পষ্ট স্বরে মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো, “ফুলবউ!” স্বপ্ন দেখছেন নাকি বাস্তবে আছেন তা দাদু যেন নিজেই বুঝতে পারছেন না। হয়তো ভাবছেন, এমন হবে না তো, একটু পরই চোখ খুলে দেখবেন সবকিছু স্বপ্ন ছিল? ছলছল চোখে দাদু তার ভালোবাসার ফুলবউকে দেখছেন।
-দাদু, এবার তো কেক কাটো!”
আমার কথায় দাদু একটু লজ্জা পেলেন। হয়তো নাতি নাতনীদের সামনে এভাবে ফ্যালফ্যাল করে দাদীমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন বলেই লজ্জা পেয়েছেন।
কেক কাটা হলো। সবাই সারি করে বসলাম এই সুন্দর মুহূর্তের ছবি তুলবো বলে। আশিক টেবিলের উপর ক্যামেরার সময় সেট করে দৌড়ে এসে আমার পাশে বসে কাঁধে হাত রাখলো। আমি গটমট করে আশিকের দিকে তাকিয়ে হাত সরিয়ে দিলাম।
আশিক গুনতে লাগলো, “এক, দুই, তিন, চার”; পাঁচ বলেই হাতটা আবার আমার কাঁধে রাখলো। ফ্লাস দিয়ে ক্যামেরা বন্দী করে নিলো কিছু মানুষের ভালোবাসার একটা প্রেমময় ছবি।



উফ! এটা কি শব্দ রে বাবা! এমন ইংরেজী শব্দ তো এই জীবনে দেখিনি। ডিকশনারিটা তো দাদুর ঘরে দেখেছিলাম। আমি দাদুর ঘরের দিকে চললাম ডিকশনারি আনতে। কিন্তু দাদুর ঘরের দরজা বন্ধ। দাদীজানকে সিলেট থেকে রাতেই নিয়ে আসলাম। হয়তো জার্নি করে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছেন। আমি দরজায় আর টোকা না দিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিলাম। দৃষ্টি আটকে গেল বয়সের ছাপ পড়া কুচকে যাওয়া চামড়ার দুটি হাতের দিকে। দাদুভাই ডান হাত দিয়ে দাদীমার বাম হাত ধরে রেখেছেন। আর দাদীমা পরম নির্ভরতায় দাদুভাইয়ের কাঁধে মাথা দিয়ে আছেন। বাল্বের আলোতে দুজনার চোখের পানি চিকচিক করছে। ধবধবে সাদা চুলগুলো জানালা দিয়ে আসা বসন্তের বাতাসে উড়ুউড়ু করছে আর হেসে হেসে যেন বলছে, ভালোবাসার কোনও বয়স নেই।
আমি ঝট করে জানালার পর্দা ছেড়ে দিলাম। চোখ দুটো আনন্দে ছলছল করছে আমার। কাঁথা পুড়ি এই ইংরেজি শব্দের। দরকার নেই দাঁতভাঙা ডিকশনারির। অমন ভালোবাসার মুহূর্তে ডিকশনারি এখন মোটেই জরুরী কিছু না। আমরা শুধু নিজেদের ভালোবাসা নিয়েই ভালোবাসা দিবসে মেতে থাকি, কখনও বয়সের ভারে নুঁয়ে পড়া সাদা চুলের মানুষদের ভালোবাসার কথা ভাবি না। প্রতিবার ভালোবাসা দিবসে কত প্রকাশ্য ভালোবাসা দেখেছি। এবার অন্তরালে ভালোবাসা দেখলাম। এটাই আমার জীবনের আজ অব্দি শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা দিবস। বেঁচে থাকুক এমন ভালোবাসার মানুষ, বেঁচে থাকুক অন্তরালে ভালোবাসা।”

আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প প্রতিযোগিতা – ০৩ এ চতুর্থ স্থান অর্জনকারী গল্প >> যাযাবর ভালোবাসা – সাবরীণ আক্তার তন্বী

অন্তরালে ভালোবাসা । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প । লেখক পরিচিতি

লেখকঃ জান্নাতুল ফেরদৌস
ছোটগল্পঃ অন্তরালে ভালোবাসা
গল্পের জনরাঃ রোমান্টিক, ভালোবাসার গল্প
দেশের বাড়িঃ বরিশাল।
পড়াশোনাঃ বি,এস,সি ইন কম্পিউটার সায়েন্স।
চাকরির বর্তমান অবস্থাঃ বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এ সহঃ জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার (আইটি) হিসেবে কর্মরত (২০১৯)।

জান্নাতুল-ফেরদৌস-আত্মপ্রকাশ-লেখক-jannatul-ferdoues-attoprokash-writter-min

লেখক- জান্নাতুল ফেরদৌস

লেখকের কথাঃ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে। আকাশ আমার খুব প্রিয়। পছন্দ করি ঘুরতে। সৎভাবে এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকাই জীবনের লক্ষ্য।

Share this Story
Load More Related Articles
Load More By আত্মপ্রকাশ সম্পাদক
Load More In আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

নীরু >> মাহমুদা মিনি । ভৌতিক । আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

মাহামুদা মিনি রচিত ‘নীরু’ ভৌতিক ছোটগল্পটি  ‘আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত ...

Facebook

আত্মপ্রকাশে সাম্প্রতিক

আত্মপ্রকাশ নির্বাচিত গল্প

 

attoprokash-bannar

আত্মপ্রকাশে নির্বাচিত গল্পে আপনার গল্পটি প্রকাশ করতে ক্লিক করুন  >> গল্প প্রকাশ

অথবা যোগাযোগ করুন – ফেইসবুক ইনবক্স

ইমেইলঃ attoprokash.blog@gmail.com